join facebook page

Monday, 22 September 2014

চাঁদপুর, শুক্রবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ৪ আশ্বিন (shishi kantha)

মনুষ্যত্ব
সোহানুর রহমান অনন্ত
স্কুল থেকে মন খারাপ করে বাসায় এলো অন্তু। এসেই সোজা মায়ের ঘরে চলে গেল। অন্তুর মা তখন টিভি সিরিয়াল দেখছে। ঘরের এক কোণে এসে মুখ ভার করে দাঁড়িয়ে রইলো অন্তু। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে অন্তুর মা জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে অন্তু? অন্তু কোন কথা বলল না। কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে অন্তুর মা আবার জিজ্ঞেস করল, বাবা কি হয়েছে? অন্তু এবার মুখ খুলে, আচ্ছা মা লিমনরা কি আমাদের চেয়ে অনেক বড় লোক? হঠাৎ এই কথা কেন বলছো, কি হয়েছে তোমার? না তেমন কিছু নয়। আজ লিমন নতুন গাড়িতে করে স্কুলে এসেছে তাই জিজ্ঞেস করলাম। মা তুমি না বলেছিলে লিমনের বাবার চেয়ে আমার বাবার বেতন বেশি। পদটাও আমার বাবার উপরে তবে কেন মা আমাদের এত টাকা নেই? সেটা তোমার বাবাকেই জিজ্ঞেস করো। এখন যাও হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আসো।

রাতে খাবার টেবিলে বসে অন্তু বাবাকে প্রশ্ন করে। আব্বু তোমার টাকা এত কম কেন? ছেলের কথা শুনে প্রথমে আতিকুর রহমান চমকে যায়। হঠাৎ এই প্রশ্ন করছো কেন বাবা? না মানে লিমন আমাকে বলেছে ওর নাকি টিচারের অভাব নেই। তাছাড়া ওর পেছনেই নাকি তিনজন চাকর সারাক্ষণ থাকে। ছেলের কথা শুনে এবার হেসে উঠে আতিকুর রহমান। তুমি তো দেখছি লিমনদের সম্পর্কে সবি জানো, ছেলের উদ্দেশ্যে বলে আতিকুর রহমান। হ্যাঁ জানিতো অনেক কিছুই কিন্তু? কিন্তু কি? না মানে ও আগে আমার বন্ধু ছিল। এখন আর আমার সাথে তেমন একটা কথা বলে না। আমার নাকি টাকা পয়সা কম তাই আমার সাথে ও আর চলবে না। বাবা তুমিই বলো ওর বাবার থেকে তো তোমার বেতন বেশি তাহলে আমাদের নতুন গাড়ি নেই কেন? কেন আমার চার পাঁচটা টিচার নেই? অন্তুর মা বলে এবার ছেলের কথার উত্তর দাও?

আতিকুর রহমান অন্তুকে বলে, আগে খাবার শেষ করো। তারপর আমার ঘরে এসো, বলছি।

খাওয়া দাওয়া শেষ হলে অন্তুকে ওর বাবা নিজের ঘরে নিয়ে যায়। তারপর প্রশ্ন করে আচ্ছা বাবা বলোতো পড়াশোনা করে তুমি কী হতে চাও? অন্তু চটপট উত্তর দেয় ডাক্তার। আচ্ছা এবার বল পড়াশোনা করার প্রধান উদ্দেশ্য কী? পড়াশোনা করার অর্থ হচ্ছে নিজের মনুষ্যত্বকে চেনা, অজানাকে জানা, ভাল এবং মন্দর মধ্যে পাথর্ক্য করতে শেখা ইত্যাদি। আচ্ছা এবার বল তোমার কি মনে হয় পড়াশোনা করে সবাই এসব চিন্তে করে? অন্তু এবার মাথা নাড়িয়ে বলে- মনে হয় না। দেখ যত বড় বড় দুর্নীতি আছে তার সাথে কিন্তু বড় বড় শিক্ষিত লোকরাই জড়িত। লিমনের বাবা আমার চেয়ে পাঁচ হাজার টাকা কম বেতনে চাকুরি করে, তবুও তাঁর সবই আছে কিন্তু কি নেই জানো? কি বাবা? নেই মনুষ্যত্ব। দুর্নীতি করে আজকে সে তাঁর ভাগ্য বদলিয়েছে ঠিকই কিন্তু মনের কালির দাগ মুছতে পারেনি। এই আমাকে দেখ। আমি একজন সরকারি কর্মকর্তা অথচ আজ পর্যন্ত কারো কাছ থেকে এক টাকা ঘুষ খাইনি। দুর্নীতি করিনি কখনো, হালাল পথে টাকা কামিয়েছি। আমার এতদিনের কর্মের ফসল হিসেবে পেয়েছি মানুষের ভালবাসা,স্নেহ, সম্মান। আমি মরলে মানুষ আমার জন্য কাঁদবে। কেন কাঁদবে জানো? অন্তু আবার বলে কেন? কারণ আমি এমন কিছু কাজ করেছি যা মানুষ আমাকে চিরকাল স্মরণ রাখবে। আর লিমনের বাবা গরিব দুখী, দিনমুজুরের কাছ থেকেও ঘুষ খেয়েছে। ঘুষ ছাড়া তাঁর কলম চলে না। বল সে মরলে কি কেউ কাঁদবে? অন্তু বলে, না। এবার আতিকুর রহমান সাহেব ছেলের কাঁধে হাত রেখে বলে-সেটা জীবন নয়, যে জীবন কিছু রেখে যেতে পারে না। এই দেখ রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, কায়কোবাদ বিশ্বের আরো অনেক মনীষী আছে। তারা কি ঘুষখোর ছিল? অন্তু বলে, না। তারা কি দুর্নীতিবাজ ছিল? না। তারা এমন কিছু করে গেছে যার ফলে পৃথিবীর বুকে মানুষ যত দিন রবে তাদের কথা স্মরণ করবে। তাঁদের নিয়ে মানুষ গর্ব করে, কাব্য লেখে। কোনো ঘুষখোর কে নিয়ে তো মানুষ গর্ব করে না। কই কখনো শুনেছো কোনো ঘুষখোর বা সন্ত্রাসীকে মানুষ শ্রদ্ধা নিয়ে স্মরণ করেছে? সারাজীবন মানুষ তাদের ঘৃণা করবে এটাই স্বাভাবিক। আশা করি তোমার সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছ। অন্তু এবার বাবার কাছে এসে বলে, আব্বু আমি বড় হয়ে তোমার মত একজন সৎ ব্যক্তি হতে চাই। দোয়া করি বাবা তুমি অনেক বড় হও। তারপর থেকে অন্তু ওর বাবাকে সব সময় অনুসরণ করে। ঠিক মতো পড়াশোনা করে। লিমনের সাথে মেশে না। কিছুদিন পর লিমনের বাবাকে দুর্নীতির অভিযোগে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল। ক্লাসের সব স্টুডেন্টরা লিমনকে ঘৃৃণা করতে লাগলো। কেউ ওর সাথে আর মিশলো না। বাবার অপকর্মের ফল ছেলের ঘাড়ের উপর এসে পড়লো। অন্তু এসে ওর বাবাকে বলল. সত্যি অপরাধ মানুষকে কিছুই দিতে পারে না কেবল মানুষের ঘৃণা ছাড়া। মানুষের মত মানুষ হতে হলে মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তুলতেই হবে। তাহলেই একটি মানুষ পরিপূর্ণ মানুষ হতে পারবে।

চাঁদপুর, শনিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ৫ আশ্বিন(pathok forum)

সোনালী স্বপ্ন
সোহানুর রহমান অনন্ত
সারাদিন পথে পথে কাগজ কুড়ায় মন্টু। ক্ষুধা পেলে রাস্তার পাশের টিউবওয়েল থেকে পানি খায়। রাতের বেলা রাস্তার পাশে ছালা বিছিয়ে ঘুমায় মাথার নিচে শক্ত ইট দিয়ে। মন্টুর সাথে ওর বয়সী আরো অনেক টোকাই আছে এখানে। কিন্তু মন্টু ওদের সাথে মেশে না। ওরা নেশা করে, নেশা খুব খারাপ কাম এটা মন্টু জানে। মন্টু এ লাইনে একেবারে নতুন। আগে একটা হোটেলে কাজ করতো, কয়েক দিন আগে সেখান থেকে পালিয়ে এসেছে। হোটেলের মালিক লোকটা বেশি একটা সুবিধার ছিলো না। মন্টুকে খুব খাটাতো বিনিময়ে দিতো বাসি খাবার। সেদিন হাত থেকে পড়ে একটা গ্লাস ভেঙে গিয়েছিলো তাই লোকটা মন্টুকে খুব মারধর করে। সেদিন রাতেই মন্টু পলিয়ে আসে।

আজ বেশি একটা কাগজ কুড়াতে পারেনি মন্টু। বৃষ্টি হয়েছিলো, তাই এ অবস্থা। রাতের বেলা রাস্তার পাশে বসে গাড়ির আসা যাওয়া দেখছে। পেটে টান টান ক্ষুধার উত্তেজনা। এমন সময় সেখানে কয়েকটা ছেলে এসে দাঁড়ালো।

মন্টুর সামনে দাঁড়িয়ে একটি ছেলে বললো, এই লাইনে নতুন?

ছেলেটির দিকে তাকালো মন্টু। মুখের মধ্যে খোঁচা খোঁচা দাড়ি আছে। গালের মধ্যে সেলাইয়ের দাগ।

মন্টু মাথা নিচু করে বললো জ্বি নতুন এসেছি।

নাম কি? পাশে থাকা একটি ছেলে প্রশ্ন করে।

মন্টু।

আগে কী করতা?

হোটেলে চাকুরি করতাম।

আমগোরে চেনো?

জ্বে না।

কি হালায় আমগোরে চেনে না, ছেলেগুলো হাসাহাসি করতে লাগলো। মাঝখানে থাকা ছেলেটা বললো এই যে, এই এলাকায় আছত, এইটা আমাগো এলাকা বুঝলি। এখানে থাকতে হলে আমগোরে চান্দা দিয়া থাকতে হয় বুঝলি। এখন ক� তো পকেটে কতো টেকা আছে।

মন্টু ঘাবড়ে গেলো, তোতলাতে তোতলাতে বললো, না আমার কাছে কোন টাকা নেই। মাঝখানের ছেলেটা বললো, তোরা দু�জন দেখতো ওর পকেটে কি আছে? হুকুম নাযিল হতেই ছেলে দু�টি মন্টুকে টেনে তুললো বসা থেকে। তারপর পকেট থেকে বের করে আনলো বিশ টাকার একটি নোট। মন্টু ওদের সাথে টানাটানি করতে গিয়ে নিজের ছেড়া শার্টটা আরো ছিড়ে ফেলে। টাকা নিয়েই ছেলেগুলো সেখান থেকে পালিয়ে যায়।

মন্টুর দু�চোখ দিয়ে জল ঝড়তে থাকে। কত কষ্ট করেই না টাকাটা জমিয়েছিলো। কিন্তু পাষাণ ছেলেগুলো অসহায় ওর কাছ থেকে তা কেড়ে নিল। মন্টু জানে না ওর বাবা কে? কি-বা ওর পরিচয়। কোথায় বাড়ি, কোথায় ঘর এসব ও কিছুই জানে না। ছোট থেকেই মানুষের ধিক্কার খেয়ে এতটুকু বয়স পর্যন্ত এসেছে। কেউ আজ পর্যন্ত ওকে আপন করে নেয়নি। কেউ ওর বন্ধুও হয়নি কোনদিন। শুধু এ পথ আর রাস্তার পাশে ল্যাম্প লাইটগুলো ছাড়া। মন্টুর কাছে যখন বেশ একা একা লাগে ল্যাম্প লাইটের সাথে কথা বলে। উত্তরের আশায় নয় বরং নিজের কষ্টগুলো বলে যাওয়ার আশায়। মন্টু নামটি ওর কে রেখেছে সেটাও জানে না। শুধু জানে মন্টু এ পৃথিবীতে বড় একা। আর মানুষ যখন বড় একলা হয়ে যায় তখন সে অসহায় ও ঘৃণার পাত্র হয়ে বেঁচে থাকে এ পৃথিবীর বুকে।

পরদিন ঠিক একি অবস্থা হলো। সারদিন কাগজ কুড়িয়ে এসে মন্টু যখন রাস্তার পাশে দাঁড়ালো। ছেলেগুলো এসে জোর করে ওর টাকাট নিয়ে গেলো। আজও মন্টু কিছু বলতে পারলো না। এভাবেই তিন চারদিন টাকা নেয়ার পর মন্টু ভাবলো সে এখানে আর থাকবে না। এখানের ছেলেগুলা একটুও ভালা না। তাই সে পরদিন সেখান থেকে চলে গেলো। এরি মধ্যে দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। পাক হানাদার বাহিনী, ঝাপিয়ে পড়ছে বাঙালি মানুষদের ওপর। চারিদিকে মানুষের করুণ আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠলো। জায়গা-জমি, ঘর-বাড়ি রেখে সবাই পালাতে লাগলো একটু নিরপদ আশ্রয়ের খোঁজে।

বাঙালি বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেশের ডাকে সাড়া দিয়ে ঝাপিয়ে পড়লো এ দেশের মাটি রক্ষা করার জন্য। মন্টু খুব ছোট, যুদ্ধ করার মতো বয়স ওর হয়নি। কিন্তু ও যুদ্ধে যেতে চায়। জন্মের পর থেকে কেউ ওরে আপন করে নেয়নি কেবল এ মাটি ছাড়া। আজ এ মাটিকে রক্ষা করতে নিজের প্রাণটি পর্যন্ত দিতে রাজি মন্টু।

সেখান ছেড়ে অনিক অনেক দূরে চলে এলো। নতুন জায়গায়। চারিদিকে গাছ-গাছালি ভরা। আঁকা-বাঁকা কাঁচা রাস্তা, গ্রাম্য পরিবেশ। এখানে এসে বাজারের রাস্তা পরিষ্কার করার কাজ পায় মন্টু। ঘুমায় রাস্তার পাশে।

একদিন মাঝ রাতে মন্টু ঘুমিয়ে আছে রাস্তার পাশে। হঠাৎ কিছুর শব্দ পেয়ে মন্টু ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলতেই মন্টু দেখে, কালো চাদর মুড়ি দেয়া কয়েকজন লোক এদিকে আসছে। মন্টু প্রথমে পাকবাহিনী ভেবে ভয় পেয়ে যায়। শোয়া থেকে উঠে বসে। লোকগুলো কাছে আসতেই মন্টু ভয়ে কাঁপতে লাগলো। শেষে লোকগুলো মন্টুর অবস্থা দেখে বললো, ভয় পেয়ে না ছোট ভাই আমরা পাক হানাদার নই, আমরা মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধার কথা শুনতেই সাহসে মন্টুর বুকটা ভরে উঠে। পাশে থাকা একজন মুক্তিযোদ্ধা বললো, রাস্তার পাশে তুমি কি করো? মিলিটারি ঘুরতাছে, তোমার ডর করে না? মন্টু মাথা উঁচু করে বললো আমার কোনো ঘর-বাড়ি নাই। এ রাস্তাই আমার ঘর-বাড়ি। আর ডর ভয় তো ওল্টা আমারে ডরায়। লোকগুলো অবাক হয়ে যায় মন্টুর কথা শুনে।

একজন মুক্তিযোদ্ধার হাতে ধরে মন্টু বললো, আমারে আপনেগো সাথে নেবেন। আমি দেশের জন্য যুদ্ধ করতে চাই। মুক্তিযোদ্ধারা অবাক হয়ে যায় এতুটুকু ছেলের কথা শুনে। তারপর একজন বললো, দেখ তুমি এখনো অনেক ছোট। তুমিতো যুদ্ধ করতে পারবে না। কথাটা শুনে মন্টুর মুখ কালো হয়ে গেলো। তাৎক্ষণিক আবার বললো, আইচ্ছা আমি কি আপনাগো কোনো উপকার করতে পারুম না?

এমনিতে তুমি কি করো?

আমি কাগজ কুড়াই, বাজারের রাস্তা ঝাড়� দেই।

তাইলো তুমি আমগো অস্ত্রগুলান এক ক্যাম্প থেকে অন্য ক্যাম্পে বা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছাইয়া দিতে পারো। তুমি কাগজ কুড়াও তাই তোমারে মিলিটারিরা সন্দেহ করবো না। মন্টু রাজি হয়ে গেলো ওদের কথায়। মুক্তিযোদ্ধারা মন্টুকে ক্যাম্পে নিয়ে গেল।

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান লিটন ভাই মন্টুর সাহস এবং মনোবল দেখে খুব খুশি হলেন। তিনি মন্টুকে খুব পছন্দ করলেন। পরদিন থেকেই দেশের জন্য ওর কাজ শুরু হয়ে গেলো। জীবন বাজি রেখে নিজের কাগজের ব্যাগে গোলাবারুদ মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতে লাগলো।

একদিন মন্টু কাগজের ব্যাগ নিয়ে এক মুক্তিযোদ্ধার ক্যাম্পে যাচ্ছিলো, হঠাৎ করে পাকহানাদার বাহিনীর সামনে পড়ে গেলো।

ওর দিকে পিস্তল তাক করে কয়েকজন এগিয়ে এলো। সাথে ছিলো একজন অফিসার এবং কয়েকজন লোক। হাত-পা বাধা বাঙালি। মন্টু ভয়ে থর থর করে কাঁপতে লাগলো। মন্টুর সামনেই বাঙালিদের নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। মন্টু ভয়ে অফিসারের পায় জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। আর বললো স্যার হ্যামি টোকাই মানুষ। হ্যামারে মাইরেন না। মন্টুর কান্না দেখে অফিসারের দয়া হলো, তাই সে মন্টুকে না মেরে কাছে ডেকে নিলেন।

তু টোকাই হে?

জ্বি স্যার

আচ্ছা, তু তো জানতাহে ইদার মে মুক্তি কাহা হে?

হা স্যার

কাহা?

মন্টু আঙুল দিয়ে ভুল পথের দিকে দেখিয়ে দিলো।

অফিসার খুশি হয়ে বললো, যা মে তুজ কো ছোড় দে তা হু, যাহ্।

নতুন জীবন পেয়ে মন্টু ছুটে গেলো পাখির মতো এবং মুক্তিযোদ্ধাদের খবরটা জানালো যে পাকসেনাদের ওল্টো রাস্তা দেখিয়ে এসেছে। ঠিক তখনি মুক্তিযোদ্ধারা সেই রাস্তায় গিয়ে ফাঁদ পেতে রইলো। পাক সেনারা আসতেই শুরু করলো গুলি। ব্যাস সব মরে সাফ।

এভাবেই মন্টু একের পর খবর দিতে লাগলো মিলিটারীদের সম্পর্ক। আর ছালার বস্তায় করে গোলাবারুদ, মেশিনগান মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতে লাগলো। যুদ্ধ চলতে লাগলো।

মন্টু একদিন রাতে স্বপ্ন দেখলো দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। লাল-সবুজ পতাকা সবাই বিজয়ের গান গাইছে। মুক্ত পাখিরা আকাশে উড়ছে, রক্ত স্রোত বন্ধ হয়ে গেছে। সেই সোনালী স্বপ্ন মন্টু মুক্তিযোদ্ধার প্রধান লিটন ভাইকে বললো। লিটন ভাই হেসে বললো তোমার স্বপ্ন সত্যি হবে মন্টু।

সেদিন মন্টু কাশবনের পাশ দিয়ে ফিরছিলো। পাক-বাহিনীর সম্পর্কে একটা জরুরি খবর দিতে হবে লিটন ভাইকে। এমন সময় দেখে কয়েকজন লোক এদিকে আসছে। লোকগুলো মন্টুর কাছে আসতেই মন্টু ওদের চিনতে পারলো। আকবর ভাই আর করিম ভাই। ওরা দু�জন ক্যাম্পের পাশে থাকে। আকবর ভাই কাছে এসে বললো মন্টু তোমাকে লিটন ভাই এখনি যেতে বলেছে। মন্টু বলল আমিতো লিটন ভাইয়ের কাছেই যাচ্ছি, চল আমরা ক্যাম্পে যাই। লিটন ভাই ক্যাম্পে নেই মন্টু ওনি একটা গোপন জায়গায় আছে। কোথায়? চল তোমায় নিয়ে যাচ্ছি। মন্টু ওদের পেছনে হাঁটতে লাগলো। লোকগুলো মন্টুকে কিছু দূর হরিপুরের কাছের একটা স্কুলের ভেতর নিয়ে গেলো। কোনো মুক্তিকেই মন্টু দেখতে পেলো না। তাই মন্টুর কেমন যেন ভয় করছে। লোকগুলোর মতলব ঠিক ভালো নয়। একটু পরেই মন্টু আসল সত্যটা জেনে গেলো। আসলে ও যাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা ভেবেছে আসলে ওরা রাজাকার। এ দেশের শুত্রু। মন্টুকে ওরা পাকহানাদের হাতে তুলে দিলো। মন্টু বুঝতে পারছিলো যে ওর আর বাঁচা হবে না। তাই মরার আগে দেশের জন্য একটা ভালো কাজ করে যেতে চায়। স্কুলটির ভেতরে বেশ কয়েকজন রাজাকার ছিলো। রাজাকাররা মন্টুর অবস্থা দেখে হাসতে লাগলো। আর পাকিস্তান জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ বলতে লাগলো। মন্টু ওদের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো, এ দেশ তোদের নয়, এ দেশের মাটিও তোদের নয়, তোগো এ দেশের বুকে বেঁচে থাকার কোনো হক নেই। ছালার বস্তা থেকে বোমা বের করে মন্টু ফাটিয়ে দিলো। আর সাথে সাথে স্কুলটির ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটলো। রাজাকারদের হাসি থেমে গেলো। পাকহানাদারদের ক্যাম্প ধ্বংস হয়ে গেলো। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে মন্টু পাকহানাদের শেষ করে গেলো। এদিকে লিটন ভাই মন্টুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো কিন্তু মন্টু আর ফিরে এলো না। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলো। কালো মেঘের ফাঁকে উঁকি দিলো একটি স্বাধীন সূর্য। চারিদিকে লাল-সবুজের পতাকা হাতে সবাই বিজয়ের গান গাইতে লাগলো। মন্টুর স্বপ্ন সত্যি হলো। মন্টুর মতো এমন লাখো লাখো বাঙালির রক্তের উপর ভর করে দাঁড়ালো আরেকটি দেশ। বাংলাদেশ।


Monday, 1 September 2014

31-08-2014 Daily Prothom alo Bundhu sovay amar golpo

জোছনার সুখ-দুঃখ

সোহানুর রহমান

ঘুমের ঘরে নাক ডাকছে সোহেল, শব্দটা একেবারে সহ্য হয় না জোছনার। বিয়ে হয়েছে আজ পাঁচ বছর, কোনো ছেলেমেয়ে হয়নি জোছনার সংসারে। এই কষ্টটা তাড়া করে বেড়ায় খুব। সোহেল একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে। কাজ আর ঘুম—এটা ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। ঘরে যে একটা বউ আছে, তাকেও যে সময় দিতে হয়, সেটা যেন সোহেলকে বুঝিয়ে দিতে হয়। জোছনা তাকিয়ে থাকে মোবাইলের স্ক্রিনে, ফেসবুকেই তার সময় কাটে বেশি। একা একটি মেয়ের আর কীই-বা করার আছে। জোছনা বেশ কয়েকবার সোহেলকে বলেছে, ‘চলো, ছাদে গিয়ে আকাশ দেখি।’ কিন্তু সোহেল খাওয়াদাওয়া করে শুয়ে পড়ল। কত শখ করে সেজেছিল, কপালে লাল টিপ পরেছিল। এগুলো দেখার আগ্রহটাও যেন সোহেলের নেই। দিন দিন সংসারের প্রতি অনিহা জেগে উঠেছে, জোছনার। জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখে। চোখ দিয়ে ঝরে পড়ে অশ্রু, চাঁদের আলোয় ঝলসে ওঠে। নারীজনম সত্যি খুব কষ্টের।
খুব সকালে উঠে সোহেল অফিসে চলে যায়। আজ জোছনার মনটা খুব খারাপ। খুব ইচ্ছা হচ্ছিল দূরে কোথাও ঘুরে আসতে। সোহেল চলে যেতেই জানালার পাশে এসে বসে, হালকা বাতাস এসে চুলগুলো এলোমেলো করে দেয়। মেঘলা আকাশ বৃষ্টি আসার অপেক্ষায়। হঠাৎ কলবেলের শব্দ। জোছনা উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেয়।
সোহেল তুমি?
দরজার সামনে সোহেল একগুচ্ছ ফুল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। ‘হ্যঁা আমি, তোমাকে চমকে দিলাম, আজ যে তোমার বার্থ ডে, সেটাই ভুলে গেলা?’ জোছনা অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়, আসলেই নিজের জন্মদিন নিজেই ভুলে গেছে। সোহেল জোছনার হাত ধরে ছাদে নিয়ে যায়। ‘চলো, আজ একসঙ্গে দুজন বৃষ্টিতে ভিজব, তারপর বিকেলে সারা শহরটা ঘুরব।’ জোছনার খুশিতে মনটা ভরে ওঠে। সবই সত্যি, নাকি কল্পনায় ঘটছে। বৃষ্টিতে ভিজে যায় দুজন, ভিজে জোছনার মনের দেয়াল। সোহেল পকেট থেকে একটা ডায়মন্ডের আংটি বের করে জোছনার আঙুলে পরিয়ে দেয়। ‘এটা তোমার বার্থ ডে গিফট।’ জোছনা তাকিয়ে থাকে সেই দিকে, নিজেকে আজ পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হচ্ছে। হঠাৎ বজ্রপাতের বিকট শব্দ হয়। সোহেলের হাতটা আরও শক্ত করে ধরে জোছনা।
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর, ২০১৪> Daily Bangladesh Potidine>রকমারি
রম্য

ফেসবুকে নতুনত্ব
সোহানুর রহমান অনন্ত

* কাজী অফিস : দিনকে দিন ফেসবুক-এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে, পাবলিক এখন পারলে খাওয়া-দাওয়াটাও ফেসবুকে করে। যেহেতু এখানে লাখ লাখ মানুষের আনাগোনা তাই ফেসবুকে কাজী অফিস খোলা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি পাত্র-পাত্রীর ছবি ও বায়োডাটা থাকবে এবং পছন্দমতো পাত্র বা পাত্রীকে যাচাই-বাছাই করে বিয়ে করতে পারবে। এমনটা করলে মন্দ হয় না।

* সেরা লাইক সুন্দরী : টিভি রিয়েলিটি শো-এর পাশাপাশি ফেসবুকেও সেরা সুন্দরী খোঁজা যেতে পারে। যেভাবে সারা দিন তরুণীরা সেলিব্রেটিদের মতো ছবি আপলোড মারে, তাতে এমনটা করা যেতেই পারে। কমেন্ট ও লাইকের মাধ্যমে সেরা ফেসবুক লাইক সুন্দরী নির্বাচিত করা যেতে পারে। এমনটা করলে ফেসবুক নতুন মাত্রা পাবে।

* অটো ঝগড়া অ্যাপস : ফেসবুক মানেই হাসাহাসি ঝগড়া। সরকারি দল-বিরোধী দল, বউ-স্বামী, প্রেমিক-প্রেমিকা ইত্যাদির ঝগড়া। কিন্তু ঝগড়ার সময় অনেকেই দিক হারিয়ে ফেলেন, অথবা কথা খুঁজে পান না। তাই তাদের জন্য ঝগড়া অ্যাপস বের করা যেতে পারে। এই অ্যাপস অটো ঝগড়ার উত্তর দেবে। সুতরাং নো চিন্তা ডু ঝগড়া।

* আঁতেল কবি নির্বাচন : ফেসবুকে কিছু আঁতেল কবি আছে, যারা সারা দিন আজাইরা কবিতা ও স্ট্যাটাস আপলোড মারে। তাদের দিয়ে ফেসবুক আঁতেল কবি নির্বাচন করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে তারা তাদের কবিতা দিয়ে বিভিন্ন স্লোগান তৈরি করে পোস্ট দেবে এবং ফেসবুক ভোটের মাধ্যমে একজন আঁতেল কবি নির্বাচিত করা যেতে পারে। যার কবিতা দিয়ে বই বের করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আঁতেলদের আজাইরা পোস্ট মারা কমে যাবে।

* ফেসবুক সিরিয়াল : একঘেয়েমি চ্যাট করতে করতে অনেকেই বিরক্ত হয়ে যান। তাই ফেসবুকেও সিরিয়ালের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে চ্যাট করার পাশাপাশি সিরিয়াল দেখেও পাবলিক বিনোদন পাবে।

Saturday, 30 August 2014


আমার মনে পড়ল শৈশবের কথা। আহা! কত ভিজেছি শ্রাবণের বৃষ্টিতে। শহরে এসে তো মেশিন হয়ে গেছি। আবেগ-অনুভূতি সব ভোঁতা হয়ে গেছে। শুধু খাওয়া আর ঘুমানোই যেন নিত্যদিনের রুটিন এখন। ভিজতে ভিজতে প্রেস ক্লাবের সামনে দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। রাস্তার দু'পাশের হলুদ লাইটগুলো জ্বলে উঠেছে। ঘোলাটে আলোর দিকে তাকালে নিমিষেই কল্পনায় হারিয়ে যাওয়া যায়। নন্দিনীর কথা বড্ড বেশি মনে পড়তে লাগল। ভার্সিটিতে পড়া অবস্থায় বৃষ্টি দেখলেই ফোন দিয়ে বলত, 'চল, রিকশায় করে পুরো ঢাকা শহর ঘুরে বেড়াই অথবা হাতে হাত রেখে কোনো রেললাইনের পথ ধরে হেঁটে যাই বহুদূর।'
মেয়েটি পাগলি বটে। আজ নন্দিনী নেই, আছে শুধু ওর স্মৃতি। যে স্মৃতিগুলো বৃষ্টিতে ভিজে আবার রোদে শুকিয়ে যায়। প্রবল বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে একসময় ভেজা শরীর নিয়ে বাসায় ফিরলাম। রাতে প্রচণ্ড জ্বর এলো। এটা অনাকাঙ্ক্ষিত নয়, ইদানীং বৃষ্টিতে ভিজলেই শরীর কাঁপিয়ে জ্বর আসে। জ্বরকে আমি খুব ভয় পাই। এই শহরে আপন বলতে কেউ নেই। চোখ বন্ধ করে তাই মায়ের আদর খুঁজছিলাম। কাঁথাটা পাতলা টিস্যু মনে হচ্ছে, খুব শীত লাগছিল। মায়ের ছবিটা মাথার কাছে রেখে দিলাম। ঠিক যেমনটি ছোটবেলায় জ্বর এলে মা মাথার কাছে বসে থাকতেন। রাত বাড়তে থাকে আর আমার মুখ দিয়ে একটি শব্দ বের হয় মা... মাগো! বুঝতে পারি কণ্ঠটা ধরে এসেছে। চোখ ভিজে উঠেছে।

২৮ আগস্ট ২০১৪, বৃহস্পতিবার daily noyadeganta

কাছে-দূরে
সোহানুর রহমান অনন্ত

কাউন্টারে তিল ধারণের জায়গা নেই। কোনো রকম বাসে উঠে বসলাম। এত বিরক্তির মধ্যেও আনন্দ আছে। বাড়ি ফেরার আনন্দ, মায়ের মুখ দেখার আনন্দ। আমার পাশের সিটে একটি মেয়ে বসেছে; যাকে বলে একেবারে আধুনিক স্টাইলের মেয়ে। আমি ব্যাগটা রেখে বসে পড়লাম। পাশের সিটের মেয়েটি কানে হেডফোন লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে গান শুনছে।
আমি মাঝে মধ্যে মেয়েটির দিকে টেরাভাবে তাকাচ্ছিলাম। সে একমনে গান শুনে যাচ্ছে। বাস চলতে শুরু করল ধীরে ধীরে। ইট-পাথরের শহর ছেড়ে দূর গাঁয়ের উদ্দেশে। গাড়ির মধ্যে যাত্রীদের হইচই থেমে গেছে। আমার চোখ একবার জানালায়, একবার মেয়েটির দিকে। পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফেসবুক ওপেন করলাম। পিকচারবিহীন মেয়েটির মেসেজ। অবশ্য অনেক আগে পাঠিয়ে রেখেছে।
আমি কোনো উত্তর না দিয়ে হোমপেজ দেখছিলাম। এমন সময় পাশের মেয়েটি কানের হেডফোন খুলে একবার আমার দিকে তাকাল। তারপর জানালা দিয়ে বাইরে চোখ রাখল। আমি আবারো টেরা চোখে তাকাতে লাগলাম। ছেলেদের মনের ভাষা বুঝে ফেলার অসাধারণ এক মতা নাকি মেয়েদের মধ্যে আছে। সেটাই সম্ভবত হয়েছে। মেয়েটি বোধহয় বুঝে ফেলেছে আমার আড়চোখে দেখার ব্যাপারটা। আর তাকাব না পণ করে মোবাইলে চোখ রাখলাম। একটা স্ট্যাটাস দিলাম বাড়ি যাওয়া নিয়ে।
পিকচারবিহীন মেয়েটি এখন লাইনে। কেমন আছো? ফাইন, ইউ? আছি ভালো, তুমি? ভালো, ঈদ কোথায় করবে? বাড়িতে যাচ্ছি, ওখানেই বাবা-মায়ের সাথে করব। কিভাবে যেন পাশের সিটের মেয়েটির দিকে আবার চোখ চলে গেল। মুচকি মুকচি হাসছে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে। অবশ্য এমন একটি সুন্দরী মেয়ে পাশে বসা থাকলে চোখ ভুল করতেই পারে।
এভাবে আবার তাকানোর জন্য নিজেকেই নিজে বকতে লাগলাম। আমিও বাড়ি যাচ্ছি, এখন বাসেÑ বলল পিকচারবিহীন মেয়েটি। ভেরি গুড, তা তোমার পিকচার দাও না কেন? আমি পিকচারবিহীন মানুষ হা হা হা। কিভাবে যেন সময় চলে গেল।
বাস এসে থেমেছে জংতলা স্টেশনে। এখানেই নামব আমি। নামার আগে ইনবক্সে আরো একটা মেসেজ এলো। আপনি এখন কোথায়? পিকচারবিহীন মেয়েটি জানতে চাইল। জংতলা স্টেশনে, ঈগল কাউন্টারের সামনে বাস থেকে নামব। এই বলে মাত্র বাস থেকে নামলাম। আবারো মেসেজÑ বলেন কী! আমিও তো জংতলা স্টেশনে, ঈগল বাসে বসে আছি। বেশ উত্তেজিত হয়ে গেলাম, কোথায় তুমি? আমি তো বাসের কাছেই। মেয়েটি জানালা দিয়ে মাথা বের তাকাল। আমিও তাকালাম, চোখে চোখ পড়ে গেল। বাস ততণে চলতে শুরু করেছে।
হায় নিয়তি! এতটা পথ যার সাথে বসে এলাম সেই যে পিকচারবিহীন বালিকা, সেটা কে জানত। বাস এক সময় চোখের আড়াল হয়ে গেল। আমি তখনো তাকিয়ে রইলাম। ফেসবুক ইনবক্সে মেসেজের টুংটাং শব্দ।
প্রকাশ : ২৬ আগস্ট, ২০১৪ >সুহৃদ সমাবেশ> daily somokal

বিবাহিত ব্যাচেলর
সোহানুর রহমান অনন্ত
দূর থেকে দেখলে বোঝাই যায় না, এটা টু-লেট না টয়লেট লেখা। কলিংবেল চাপতেই এক ভদ্রলোক খুলে দিলেন। কী চাই? না মানে বাইরে টু-লেট দেখলাম...। ব্যাচেলর? হেসে বললাম বিবাহিত ব্যাচেলর। মানে? মানে হলো বিয়ে করেছি কিন্তু বউ দেশের বাড়িতে থাকে। তার মানে তুমি একা থাকবে? জি বলতে পারেন। কী কর? পত্রিকা অফিসে চাকরি করি। সাংবাদিক? না, ফটোগ্রাফার। ও। কিন্তু তোমাকে ভাড়া দেওয়া যাবে না। হাসিটা মিলিয়ে গেল আমার। কেন? কারণ তুমি বিবাহিত হলেও ব্যাচেলর থাকবে। তাতে কী, বউ তো মাঝে মধ্যে আসে। একটু দাঁড়াও, আমি আসছি। আমাকে দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে লোকটা ভেতরে চলে গেল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পর এসে বলল, তোমার সাহস কেমন? জি মাশাল্লাহ ভালো, কিন্তু কেন? তোমাকে ছাদে যে রুমটায় থাকতে হবে সেটায় একটু সমস্যা আছে। কী সমস্যা? সেটা হলো সেই রুমে একটি মেয়ে থাকত, মাসখানেক আগে মেয়েটি গলায় ফাঁস নিয়ে মারা যায়। এরপর আর রুমটা ভাড়া দিতে পারিনি। যারাই ভাড়া নেয় দু'তিন দিন থেকে চলে যায়। কোনো সমস্যা নেই, আমি এসব বিশ্বাস করি না। ঠিক আছে দেখ থাকতে পার কি-না।
২.
আসলেই কি ভয় পাচ্ছি আমি, বুকে একটু ফুঁ দিয়ে নিলাম। মিথ্যা কথাটা গুছিয়ে না বলতে পারলে হয়তো এ বাসাটাও পেতাম না। ভূতের হোক আর যাই হোক মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই তো হয়েছে। ব্যাচেলর বলে কি আমরা মানুষ না। এমন সময় দরজায় ঠকঠক শব্দ। বুকটা দপাস করে উঠল। দোয়া যা জানতাম সব পড়ে ফেলেছি। আস্তে আস্তে গিয়ে দরজা খুললাম। একটা মেয়ে দাঁড়ানো হাতে খাবারের বাটি। কী ব্যাপার কানে কি তুলো দিয়েছেন? ইয়ে মানে... আপনি। আপনার বাড়িওয়ালার মেয়ে। বাবা বাসায় নেই তাই মা খাবারটা আমাকে দিয়েই পাঠিয়েছে, নিন। আমি ভয়ে ভয়ে নিলাম। কি ভয় পাচ্ছেন নাকি? না কিসের ভয়, আমি হলাম সবচেয়ে সাহসী ব্যক্তি। মেয়েটি হেসে বলল, তা আপনি নাকি বিবাহিত ব্যাচেলর। লজ্জায় পড়ে গেলাম। মুচকি হেসে চলে গেল মেয়েটি। আমি দরজা লাগিয়ে বসে পড়লাম। ভালোই হলো ক্ষুধায় পেটের অবস্থা মরুভূমি। খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
৩.
রাতটা ভালই কাটলো, সকাল সকাল অফিস চলে গেলাম। বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পথে শাহবাগে মেয়াটার সঙ্গে দেখা। মেয়েটি গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে আছে। আমি বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে বললাম, এখন গাড়ি পাওয়া যাবে না, ইচ্ছা করলে পেছনে বসতে পারেন। মেয়েটি উঠে বসল। আজ ভার্সিটিতে একটু কাজ ছিল তাই দেরি হয়ে গেল। আমি কিছুই বললাম না। আচ্ছা আপনার ছেলেমেয়ে কয়জন? নেই। বলেন কী? হুম। বিয়ে করেছেন কয় বছর হলো? করিনি। মানে? মানে বিয়ে করিনি এখনও। তাহলে বাবাকে যে বললেন। না বললে তো আর ঘরটা পাওয়া হতো না। ও মাই গড! আপনি এত বড় মিথ্যা বলেছেন। কিছু করার নেই, মিথ্যা না বলে উপায় ছিল না। তাই আব্বু জানলে, আপনাকে সঙ্গে সঙ্গে বের করে দেবে। আপনার আব্বাকে তো বলিনি, বলেছি আপনাকে। বাসার কিছুটা আগে মেয়েটি নেমে পড়ল। বাড়িওয়ালা দেখে ফেললে বিপদ। ওহ্ মেয়েটির নাম ফারিয়া, তবে ফারিয়া আমাকে বিবাহিত ব্যাচেলর বলেই ডাকবে বলে ঠিক করেছে। মোটামুটি বেশ কয়েকদিন কথা বলায় ভালোই সম্পর্ক হয়ে গেল।
৪.
ভালোবাসাটা খুব অদ্ভুত, কখন এসে যায় কেউ বলতে পারে না। ফারিয়াকে ইদানীং খুব ভালো লাগতে শুরু করেছে। সেই কথাটা বলতেও বাধা নেই, কিন্তু বলার জন্য ভালো একটা সময়ের প্রয়োজন। রাতের একটা অধ্যায় ওর সঙ্গে ফেসবুকে কাটে যদিও একই বাড়িতে থাকি আমরা। মাঝে মাঝে বাইকে করে ঘুরে বেড়াই ঢাকা শহরটা। কখনওবা রেললাইনের পথ ধরে হেঁটে যাই বহুদূর। তবুও বলা হয় না, হবে হবে এ আশায়।
হঠাৎ করেই একটা ঝড় আসে আমার জীবনে। ফারিয়ার ক্যান্সার ধরা পড়ে। অনেক ভাবি আমি, একজন মৃত্যু পথযাত্রীকে বিয়ে করে কী লাভ, শেষে সারাটা জীবন তার স্মৃতি বয়ে বেড়াতে হবে। ভালোবাসাটা চাপা দিয়ে ফেলি। বাসাটা ছেড়ে দিই আমি। ফারিয়া ঘুম থেকে ওঠার আগে এক কাকডাকা ভোরে নতুন বাসায় চলে যাই। যেখানে ফারিয়া নেই, নেই ফারিয়ার স্মৃতিগুলো। মাস তিনেকের মধ্যেই ফারিয়া মারা গেল। খবর শুনেছি আমি কিন্তু দেখতে যাইনি। পুরনো স্মৃতিকে জাগাতে চাই না। খুব তাড়াহুড়া করেই সুন্দরী কলিগকে বিয়ে করে ফেলি। জীবনটাকে নতুন করে সাজাবো বলে। আমি এক স্বার্থপর মানুষ।
৫.
ইদানীং ফারিয়াকে খুব বেশি মনে পড়ে। আমার বউকে আমি অনেক ভালোবাসি, তাই মনে পড়লেও ভুলতে চাই সেসব স্মৃতি। আজ আমাদের ঘরে আলোর প্রদীপ হয়ে আসবে আমার একমাত্র সন্তান। হাসপাতালে তখন অপেক্ষা করছি, একটা শব্দ শোনার জন্য। ডাক্তার বেরিয়ে এলো, মুখটা কালো করে। কী ব্যাপার ডাক্তার সাহেব? স্যরি, দু'জনের একজনকেও বাঁচানো গেল না। আমরা অনেক চেষ্টা করেছি। আমি যেন পাথর হলে গেলাম। ভাবতেও কষ্ট হচ্ছিল কথাটা। সবকিছু এলোমেলো লাগছিল। নিজ হাতে কবরে শুইয়ে দিলাম ভালোবাসাকে। এক এক করে সবাই চলে গেল। আমি তখনও দাঁড়িয়ে, চোখ দিয়ে জল পড়ছে। বুকের মধ্যে হাহাকার। চলে আসার জন্য পা বাড়াবো এমন সময় হঠাৎ ফারিয়ার বাবার সঙ্গে দেখা। আংকেল আপনি? হ্যাঁ বাবা, মেয়ের কবর দেখতে এলাম। ফারিয়াকে কি এখানে কবর দেওয়া হয়েছে?। হু ওই তো নতুন কবরটার পাশের কবরটাই ফারিয়ার। কবরটার দিকে তাকিয়ে বুকটা চমকে উঠল। এবার ফারিয়াকে ভুলব কী করে? আমার ভালোবাসাকে দেখতে এলেই যে পুরনো ভালোবাসাকেও দেখতে হবে।
হসুহৃদ ঢাকা