join facebook page

Showing posts with label chadpur kantha (pathok forum). Show all posts
Showing posts with label chadpur kantha (pathok forum). Show all posts

Monday, 22 September 2014

চাঁদপুর, শনিবার ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ২৯


অপরাধী
সোহানুর রহমান অনন্ত
মানুষের জীবনে কখন এসে দুর্দিন দেখা দেয় তা কেউ বলতে পারে না, বলতে পারেনি আদম আলীও। তার জীবনে আজ দুর্দিন ভয়াবহ দুর্দিন যাচ্ছে। অথচ কিছুদিন আগেও তার গোলাভরা ধান ছিলো, উঠোন জুড়ে ছিলো হাস-মুরগির বিচরণ, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর জুড়ে ছিলো বড় বড় মাছের ছোটাছুটি ছিলো। কিন্তু আজ নেই কিছুই নেই আদম আলীর। সর্বনাশা পদ্মার ভাঙ্গনে তার জীবন থেকে সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। চোখের সামনেই বাপ-দাদার ভিটা মাটি ফসলের মাঠ এক এক করে হারিয়ে গেলো পদ্মার গহীন অথৈ জলে। সবকিছু হারিয়ে নিঃশ্ব হয়ে ঢাকার শহরে পারি জমায় আদম আলী। সঙ্গে তার স্ত্রী এবং দু' মেয়ে ১০ বছরের মণি ও ৭ বছরের মুক্তা। প্রথমে ঢাকায় এসে কাজের জন্য দিশেহারা হয়ে যায় আদম আলী। পরে অনেক কষ্টে ইসলামপুর একটা মার্কেটে লেবারের কাজ পায়। দিনে যা রোজগার হতো কোনো রকম দু মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে দু' মুঠো ডাল-ভাত খেয়ে চলে যেতো কদম আলীর। এক সময় খুব আরামের বিছানায় শুয়ে দিন কেটেছিলো আদম আলীর স্ত্রী কিন্তু আজ ঠাঁই হয়েছে কমলাপুর বস্তিতে। মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আদম আলীর বউ পড়শীদের কাছে বলে কে ভেবে ছিলো আল্লাহ্ আমাদের কপালে এমন কষ্ট লেইখা রাখছে। মেয়ে দুটো সারাক্ষণ রেল লাইনের রাস্তার পাশে বসে খেলা করে, আর অপেক্ষায় থাকে কহন সন্ধ্যা হইবো আর বাপজান আইবো। কদম আলীর কোনদিন রোজগার একটু বেশি হয়, কোনদিন আবার কম হয়, যেদিন বেশি হয় সেদিন ছোট মেয়েটা মুক্তার জন্য পাকা কলা নিয়ে যায়। ছোট থেইকাই মুক্তা পাকা কলার পাগল, আর বড় মেয়ে মণি ওর কোনো ইচ্ছা নেই। কম বেশি মণি সংসারের সব কিছুই বুঝতে শিখেছে। বাপের অবস্থা ভালো করেই উপলব্ধি করছে মণি তাই ওর কোনো বায়না নেই। এভাবেই আদম আলীর সংসার এক রকম দুঃখে কষ্টে চলে যাচ্ছিলো। একদিন সন্ধ্যা বেলা গম্ভীর মুখে বাসায় ফিরে আদম আলী। এসে দেখে ছোট মেয়েটার ভীষণ জ্বর, পাশে বসে ওর মা মাথায় জল পট্টি দিচ্ছে। কহন থেইকা ওর জ্বর? প্রশ্ন করে আদম আলী। দুপুরের পর থেইকা জ্বর আইছে, আপনের মুখটা এতো শুকনা কেন? কোনো খারাপ সংবাদ। না, মানে কাইল থেইকা দুই দিন হরতাল, হরতালে দিয়াতো আর মার্কেট খুলবোনা আর মার্কেট না খুললো টেকা পয়সাও কামাইতে পারুম না। এর মধ্যে আবার মাইয়াডার জ্বর আইছে অহন যে আমি কি করি। অতো চিন্তা কইরেন না আল্লাহ একটা না একটা ব্যবস্থা কইরাই দিবো। মণি কই? আছে হয়তো রানুগো ঘরে বইসা রানুর লগে কথা কইতাছে। আপনে কয়ডা ভাত খাইয়া ঘুমানতো সারাদিন অনেক খাইট্টা আইছেন। হু, দাও দেহি কয়ডা ডাইল ভাত।

মাঝ রাতে হঠাৎ রানুর বাপ এসে আদম আলীরে ডেকে বললো কাইল থেইকা দুইদিন তো হরতাল, এইর মধ্যে তো কাজ কর্ম নাই চলো আমরা মিছিলে যাই হাজিরা দুইশো টাকা। আদম আলী মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলে না মিয়া মিছিল মিটিংয়ের ধারে কাছে যামু না। চিন্তা কইরা দেখো আদম দুই দিনে চাইরশো টেকা পাইবা না খেয়ে মরার চেয়ে তিন চাইর ঘণ্টা মিছিল কইরা যদি চাইরশো টেকা পাও তাতে মন্দ কি? আদম আলী কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। ঘরে আদরের মেয়ে মুক্তার জ্বর, চাল-ডালও নাই, ঘরে বসে থাকার চেয়ে মিছিলে গেলে মনে হয় ভালা অইবো, আমরা গরিবেরা কাজ না করলে তো আসলেই না খাইয়া মরুম। আদম আলী পাকা কথা দিয়ে দেয় রানুর বাপকে কাল সে মিছিলে যাচ্ছে। পরদিন আদম আলী মিছিলে যায়, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার মাঝে প্রথম দিন হরতাল শেষ হয়। সন্ধ্যা বেলা মেয়ের জন্য ঔষধ নিয়ে আসে আদম আলী। মুক্তার অবস্থা এখন আগের চাইতে একটু ভালো। আদম আলীকে আসতে দেখেই মাথা তুলে মুক্তা বলে আমার জন্য কলা আনছো বাপজান? হু মা আনছি কলা আনছি আম আনছি। কি মজা মণি আপার লাইগা কিছু আনে নাই সব আমার লাইগা আনছ এই বলে মুক্তা বিছানা থেকে মাথা তুলে হাসে। মণি ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলো, আদম আলী সেদিকে তাকিয়ে বলে তোর লাইগা কাইল কিছু আনুম নে মন খারাপ করিস্ না মা। আব্বা এই মিছিলে তোমার না গেলে অয় না? কি মারামারি হয় আমার ডর করে। ডর কিরে মা ঘরে বইসা থাকলে তোগোরে খাওয়াইবো কে? নে চাল আনছি ভাত রান্না কর ক্ষিধা লাগছে।

পরের দিন আবার হরতালে গেলো আদম আলী, আসার সময় মুক্তাকে বলে এসেছে আজ আবার ওর জন্য পাকা কলা নিয়ে যাবে। এ কথা শুনে খুব খুশি হয়েছিলো মুক্তা। আজকের হরতাল খুব ভয়াবহ চলছে, চারিদিকে গাড়ি ভাংচুর, পুলিশের সাথে সংঘর্ষ, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলছে। মিছিলের ঝাঁঝালো আওয়াজে তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট। হঠাৎ হরতালে পক্ষ বিপক্ষের মধ্যে মারামারি লেগে গেলো। দু চারটা বোমা ফুটলো, মানুষ দিগি�দিক ছুটতে লাগলো, কদম আলী কিছু বুঝে ওঠার আগেই কয়েকটা যুবক এসে মারতে শুরু করলো। পুলিশ চেয়ে চেয়ে দেখলো সেই দৃশ্য পুলিশের দায়িত্বের কোনো ভূমিকা পালন করলো না। আদম আলী ছেলেগুলোর পা ধরে বলতে লাগলো বাবা গো আমারে ছাইড়া দাও পেটের জ্বালায় রাস্তায় নামছি, আমি গরির মানুষ সন্ত্রাসী না। ঘরে আমার অসুস্থ মেয়ে আমার পথ চেয়ে আছে, এ বলে আবার পুলিশের পায়ে গিয়া ধরলো। ভাইরা আমারে বাঁচান ওরা আমারে মাইরা ফালাইলো। পুলিশ কিছুই করলো না ওল্টো আরো আদম আলীর শার্ট টেনে ধরে ওদের হাতে তুলে দিলো। আদম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতো লাগলো আমারে আর মাইরোনা মইরা যামু আর শয্য হইতাছে না। কিন্তু কে শুনে কার কথা নরপশুরা লাঠি দিয়ে পিটিয়ে রক্তাত করেই শান্ত� হয়নি। রাস্তার মধ্যে ফেলে মোটা লোহার শেকল দিয়ে মাথার মধ্যে কয়েক বার আঘাত করে ফেলে যায় আদম আলীকে। আদম আলীর রক্তে লাল হয়ে যায় রাস্তার ধুলো মাটিগুলো। আদম আলী চোখের সামনে আপছা আপছা আঁধার দেখতে পায়, ভেসে উঠে বড় মেয়েটির মুখ। (বাপজান তুমি মিছিলে যাইওনা আমার কেমন জানি ডর করে) সেই কচি সুর কানে বেজে উঠে। ছোট্ট মেয়েটির সেই মুখ ভারা হাসি, (বাপজান আমার লাইগা পাকা কলা আইনো, তাইলে আমার জ্বর ভালা অইয়া যাইবো) তারপর আস্তে আস্তে হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে আদম আলীর। নিভে যাচ্ছে জীবন প্রদীপ নিভে যাচ্ছে, হাজার হাজার লোক ছুটে যাচ্ছে আদম আলীর ওপর দিয়ে, কেউবা হাতে কেউবা মুখের ওপর পায়ের চাপা দিয়ে। আদম আলী চিৎকার করে ওদের বললো আমারে তোমরা একটু বাঁচাও....বাঁচাও...কেউ শুনলোনা সেই ডাক। এক সময় চারিদিকের কোলাহলের মাঝে থেমে গেলো আদম আলীর চিৎকার। নিভে গেলো আদম আলীর জীবন প্রদীপ, সেই দৃশ্য দেখে আকাশটা বুঝি কষ্ট পেয়েছিলো, কষ্ট পেয়েছিলো মেঘেরা। তাইতো আদম আলীকে একটু ছুঁয়ে দেখার জন্য বৃষ্টি হয়ে নেমে এলো বৃষ্টির দল। বাতাস থেমে গিয়েছিলো কিছুক্ষণের জন্য, গোটা পৃথিবী নিঃশব্দে কেঁদেছিলো কিছুক্ষণের জন্য। এই মৃত্যুর জন্য দায়ী কে, ক্ষুধার যন্ত্রণায় কেউ পথে বসে মরে কেউবা চেয়ে চেয়ে দেখে সেই দৃশ্য। তাই মনে আজ প্রশ্ন জাগে, আর কতদিন এভাবে পথে পথে নীরিহ গরির মানুষদের প্রাণ হারাতে হবে, দেশের এই অবস্থার জন্য কে অপরাধী। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে এলো তবুও আদম আলী ফিরলো না ঘরে, ছোট্ট মেয়েটি বাবার অপেক্ষায় বসে আছে, কখন বাপজান আসবে পাকা কলা নিয়ে। কিন্তু কে তাকে বলবে তার বাবা যে আর কোনোদিনও ফিরবে না........কোনোদিনও না।


চাঁদপুর, শনিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ৫ আশ্বিন(pathok forum)

সোনালী স্বপ্ন
সোহানুর রহমান অনন্ত
সারাদিন পথে পথে কাগজ কুড়ায় মন্টু। ক্ষুধা পেলে রাস্তার পাশের টিউবওয়েল থেকে পানি খায়। রাতের বেলা রাস্তার পাশে ছালা বিছিয়ে ঘুমায় মাথার নিচে শক্ত ইট দিয়ে। মন্টুর সাথে ওর বয়সী আরো অনেক টোকাই আছে এখানে। কিন্তু মন্টু ওদের সাথে মেশে না। ওরা নেশা করে, নেশা খুব খারাপ কাম এটা মন্টু জানে। মন্টু এ লাইনে একেবারে নতুন। আগে একটা হোটেলে কাজ করতো, কয়েক দিন আগে সেখান থেকে পালিয়ে এসেছে। হোটেলের মালিক লোকটা বেশি একটা সুবিধার ছিলো না। মন্টুকে খুব খাটাতো বিনিময়ে দিতো বাসি খাবার। সেদিন হাত থেকে পড়ে একটা গ্লাস ভেঙে গিয়েছিলো তাই লোকটা মন্টুকে খুব মারধর করে। সেদিন রাতেই মন্টু পলিয়ে আসে।

আজ বেশি একটা কাগজ কুড়াতে পারেনি মন্টু। বৃষ্টি হয়েছিলো, তাই এ অবস্থা। রাতের বেলা রাস্তার পাশে বসে গাড়ির আসা যাওয়া দেখছে। পেটে টান টান ক্ষুধার উত্তেজনা। এমন সময় সেখানে কয়েকটা ছেলে এসে দাঁড়ালো।

মন্টুর সামনে দাঁড়িয়ে একটি ছেলে বললো, এই লাইনে নতুন?

ছেলেটির দিকে তাকালো মন্টু। মুখের মধ্যে খোঁচা খোঁচা দাড়ি আছে। গালের মধ্যে সেলাইয়ের দাগ।

মন্টু মাথা নিচু করে বললো জ্বি নতুন এসেছি।

নাম কি? পাশে থাকা একটি ছেলে প্রশ্ন করে।

মন্টু।

আগে কী করতা?

হোটেলে চাকুরি করতাম।

আমগোরে চেনো?

জ্বে না।

কি হালায় আমগোরে চেনে না, ছেলেগুলো হাসাহাসি করতে লাগলো। মাঝখানে থাকা ছেলেটা বললো এই যে, এই এলাকায় আছত, এইটা আমাগো এলাকা বুঝলি। এখানে থাকতে হলে আমগোরে চান্দা দিয়া থাকতে হয় বুঝলি। এখন ক� তো পকেটে কতো টেকা আছে।

মন্টু ঘাবড়ে গেলো, তোতলাতে তোতলাতে বললো, না আমার কাছে কোন টাকা নেই। মাঝখানের ছেলেটা বললো, তোরা দু�জন দেখতো ওর পকেটে কি আছে? হুকুম নাযিল হতেই ছেলে দু�টি মন্টুকে টেনে তুললো বসা থেকে। তারপর পকেট থেকে বের করে আনলো বিশ টাকার একটি নোট। মন্টু ওদের সাথে টানাটানি করতে গিয়ে নিজের ছেড়া শার্টটা আরো ছিড়ে ফেলে। টাকা নিয়েই ছেলেগুলো সেখান থেকে পালিয়ে যায়।

মন্টুর দু�চোখ দিয়ে জল ঝড়তে থাকে। কত কষ্ট করেই না টাকাটা জমিয়েছিলো। কিন্তু পাষাণ ছেলেগুলো অসহায় ওর কাছ থেকে তা কেড়ে নিল। মন্টু জানে না ওর বাবা কে? কি-বা ওর পরিচয়। কোথায় বাড়ি, কোথায় ঘর এসব ও কিছুই জানে না। ছোট থেকেই মানুষের ধিক্কার খেয়ে এতটুকু বয়স পর্যন্ত এসেছে। কেউ আজ পর্যন্ত ওকে আপন করে নেয়নি। কেউ ওর বন্ধুও হয়নি কোনদিন। শুধু এ পথ আর রাস্তার পাশে ল্যাম্প লাইটগুলো ছাড়া। মন্টুর কাছে যখন বেশ একা একা লাগে ল্যাম্প লাইটের সাথে কথা বলে। উত্তরের আশায় নয় বরং নিজের কষ্টগুলো বলে যাওয়ার আশায়। মন্টু নামটি ওর কে রেখেছে সেটাও জানে না। শুধু জানে মন্টু এ পৃথিবীতে বড় একা। আর মানুষ যখন বড় একলা হয়ে যায় তখন সে অসহায় ও ঘৃণার পাত্র হয়ে বেঁচে থাকে এ পৃথিবীর বুকে।

পরদিন ঠিক একি অবস্থা হলো। সারদিন কাগজ কুড়িয়ে এসে মন্টু যখন রাস্তার পাশে দাঁড়ালো। ছেলেগুলো এসে জোর করে ওর টাকাট নিয়ে গেলো। আজও মন্টু কিছু বলতে পারলো না। এভাবেই তিন চারদিন টাকা নেয়ার পর মন্টু ভাবলো সে এখানে আর থাকবে না। এখানের ছেলেগুলা একটুও ভালা না। তাই সে পরদিন সেখান থেকে চলে গেলো। এরি মধ্যে দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। পাক হানাদার বাহিনী, ঝাপিয়ে পড়ছে বাঙালি মানুষদের ওপর। চারিদিকে মানুষের করুণ আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠলো। জায়গা-জমি, ঘর-বাড়ি রেখে সবাই পালাতে লাগলো একটু নিরপদ আশ্রয়ের খোঁজে।

বাঙালি বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেশের ডাকে সাড়া দিয়ে ঝাপিয়ে পড়লো এ দেশের মাটি রক্ষা করার জন্য। মন্টু খুব ছোট, যুদ্ধ করার মতো বয়স ওর হয়নি। কিন্তু ও যুদ্ধে যেতে চায়। জন্মের পর থেকে কেউ ওরে আপন করে নেয়নি কেবল এ মাটি ছাড়া। আজ এ মাটিকে রক্ষা করতে নিজের প্রাণটি পর্যন্ত দিতে রাজি মন্টু।

সেখান ছেড়ে অনিক অনেক দূরে চলে এলো। নতুন জায়গায়। চারিদিকে গাছ-গাছালি ভরা। আঁকা-বাঁকা কাঁচা রাস্তা, গ্রাম্য পরিবেশ। এখানে এসে বাজারের রাস্তা পরিষ্কার করার কাজ পায় মন্টু। ঘুমায় রাস্তার পাশে।

একদিন মাঝ রাতে মন্টু ঘুমিয়ে আছে রাস্তার পাশে। হঠাৎ কিছুর শব্দ পেয়ে মন্টু ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলতেই মন্টু দেখে, কালো চাদর মুড়ি দেয়া কয়েকজন লোক এদিকে আসছে। মন্টু প্রথমে পাকবাহিনী ভেবে ভয় পেয়ে যায়। শোয়া থেকে উঠে বসে। লোকগুলো কাছে আসতেই মন্টু ভয়ে কাঁপতে লাগলো। শেষে লোকগুলো মন্টুর অবস্থা দেখে বললো, ভয় পেয়ে না ছোট ভাই আমরা পাক হানাদার নই, আমরা মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধার কথা শুনতেই সাহসে মন্টুর বুকটা ভরে উঠে। পাশে থাকা একজন মুক্তিযোদ্ধা বললো, রাস্তার পাশে তুমি কি করো? মিলিটারি ঘুরতাছে, তোমার ডর করে না? মন্টু মাথা উঁচু করে বললো আমার কোনো ঘর-বাড়ি নাই। এ রাস্তাই আমার ঘর-বাড়ি। আর ডর ভয় তো ওল্টা আমারে ডরায়। লোকগুলো অবাক হয়ে যায় মন্টুর কথা শুনে।

একজন মুক্তিযোদ্ধার হাতে ধরে মন্টু বললো, আমারে আপনেগো সাথে নেবেন। আমি দেশের জন্য যুদ্ধ করতে চাই। মুক্তিযোদ্ধারা অবাক হয়ে যায় এতুটুকু ছেলের কথা শুনে। তারপর একজন বললো, দেখ তুমি এখনো অনেক ছোট। তুমিতো যুদ্ধ করতে পারবে না। কথাটা শুনে মন্টুর মুখ কালো হয়ে গেলো। তাৎক্ষণিক আবার বললো, আইচ্ছা আমি কি আপনাগো কোনো উপকার করতে পারুম না?

এমনিতে তুমি কি করো?

আমি কাগজ কুড়াই, বাজারের রাস্তা ঝাড়� দেই।

তাইলো তুমি আমগো অস্ত্রগুলান এক ক্যাম্প থেকে অন্য ক্যাম্পে বা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছাইয়া দিতে পারো। তুমি কাগজ কুড়াও তাই তোমারে মিলিটারিরা সন্দেহ করবো না। মন্টু রাজি হয়ে গেলো ওদের কথায়। মুক্তিযোদ্ধারা মন্টুকে ক্যাম্পে নিয়ে গেল।

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান লিটন ভাই মন্টুর সাহস এবং মনোবল দেখে খুব খুশি হলেন। তিনি মন্টুকে খুব পছন্দ করলেন। পরদিন থেকেই দেশের জন্য ওর কাজ শুরু হয়ে গেলো। জীবন বাজি রেখে নিজের কাগজের ব্যাগে গোলাবারুদ মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতে লাগলো।

একদিন মন্টু কাগজের ব্যাগ নিয়ে এক মুক্তিযোদ্ধার ক্যাম্পে যাচ্ছিলো, হঠাৎ করে পাকহানাদার বাহিনীর সামনে পড়ে গেলো।

ওর দিকে পিস্তল তাক করে কয়েকজন এগিয়ে এলো। সাথে ছিলো একজন অফিসার এবং কয়েকজন লোক। হাত-পা বাধা বাঙালি। মন্টু ভয়ে থর থর করে কাঁপতে লাগলো। মন্টুর সামনেই বাঙালিদের নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। মন্টু ভয়ে অফিসারের পায় জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। আর বললো স্যার হ্যামি টোকাই মানুষ। হ্যামারে মাইরেন না। মন্টুর কান্না দেখে অফিসারের দয়া হলো, তাই সে মন্টুকে না মেরে কাছে ডেকে নিলেন।

তু টোকাই হে?

জ্বি স্যার

আচ্ছা, তু তো জানতাহে ইদার মে মুক্তি কাহা হে?

হা স্যার

কাহা?

মন্টু আঙুল দিয়ে ভুল পথের দিকে দেখিয়ে দিলো।

অফিসার খুশি হয়ে বললো, যা মে তুজ কো ছোড় দে তা হু, যাহ্।

নতুন জীবন পেয়ে মন্টু ছুটে গেলো পাখির মতো এবং মুক্তিযোদ্ধাদের খবরটা জানালো যে পাকসেনাদের ওল্টো রাস্তা দেখিয়ে এসেছে। ঠিক তখনি মুক্তিযোদ্ধারা সেই রাস্তায় গিয়ে ফাঁদ পেতে রইলো। পাক সেনারা আসতেই শুরু করলো গুলি। ব্যাস সব মরে সাফ।

এভাবেই মন্টু একের পর খবর দিতে লাগলো মিলিটারীদের সম্পর্ক। আর ছালার বস্তায় করে গোলাবারুদ, মেশিনগান মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতে লাগলো। যুদ্ধ চলতে লাগলো।

মন্টু একদিন রাতে স্বপ্ন দেখলো দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। লাল-সবুজ পতাকা সবাই বিজয়ের গান গাইছে। মুক্ত পাখিরা আকাশে উড়ছে, রক্ত স্রোত বন্ধ হয়ে গেছে। সেই সোনালী স্বপ্ন মন্টু মুক্তিযোদ্ধার প্রধান লিটন ভাইকে বললো। লিটন ভাই হেসে বললো তোমার স্বপ্ন সত্যি হবে মন্টু।

সেদিন মন্টু কাশবনের পাশ দিয়ে ফিরছিলো। পাক-বাহিনীর সম্পর্কে একটা জরুরি খবর দিতে হবে লিটন ভাইকে। এমন সময় দেখে কয়েকজন লোক এদিকে আসছে। লোকগুলো মন্টুর কাছে আসতেই মন্টু ওদের চিনতে পারলো। আকবর ভাই আর করিম ভাই। ওরা দু�জন ক্যাম্পের পাশে থাকে। আকবর ভাই কাছে এসে বললো মন্টু তোমাকে লিটন ভাই এখনি যেতে বলেছে। মন্টু বলল আমিতো লিটন ভাইয়ের কাছেই যাচ্ছি, চল আমরা ক্যাম্পে যাই। লিটন ভাই ক্যাম্পে নেই মন্টু ওনি একটা গোপন জায়গায় আছে। কোথায়? চল তোমায় নিয়ে যাচ্ছি। মন্টু ওদের পেছনে হাঁটতে লাগলো। লোকগুলো মন্টুকে কিছু দূর হরিপুরের কাছের একটা স্কুলের ভেতর নিয়ে গেলো। কোনো মুক্তিকেই মন্টু দেখতে পেলো না। তাই মন্টুর কেমন যেন ভয় করছে। লোকগুলোর মতলব ঠিক ভালো নয়। একটু পরেই মন্টু আসল সত্যটা জেনে গেলো। আসলে ও যাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা ভেবেছে আসলে ওরা রাজাকার। এ দেশের শুত্রু। মন্টুকে ওরা পাকহানাদের হাতে তুলে দিলো। মন্টু বুঝতে পারছিলো যে ওর আর বাঁচা হবে না। তাই মরার আগে দেশের জন্য একটা ভালো কাজ করে যেতে চায়। স্কুলটির ভেতরে বেশ কয়েকজন রাজাকার ছিলো। রাজাকাররা মন্টুর অবস্থা দেখে হাসতে লাগলো। আর পাকিস্তান জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ বলতে লাগলো। মন্টু ওদের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো, এ দেশ তোদের নয়, এ দেশের মাটিও তোদের নয়, তোগো এ দেশের বুকে বেঁচে থাকার কোনো হক নেই। ছালার বস্তা থেকে বোমা বের করে মন্টু ফাটিয়ে দিলো। আর সাথে সাথে স্কুলটির ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটলো। রাজাকারদের হাসি থেমে গেলো। পাকহানাদারদের ক্যাম্প ধ্বংস হয়ে গেলো। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে মন্টু পাকহানাদের শেষ করে গেলো। এদিকে লিটন ভাই মন্টুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো কিন্তু মন্টু আর ফিরে এলো না। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলো। কালো মেঘের ফাঁকে উঁকি দিলো একটি স্বাধীন সূর্য। চারিদিকে লাল-সবুজের পতাকা হাতে সবাই বিজয়ের গান গাইতে লাগলো। মন্টুর স্বপ্ন সত্যি হলো। মন্টুর মতো এমন লাখো লাখো বাঙালির রক্তের উপর ভর করে দাঁড়ালো আরেকটি দেশ। বাংলাদেশ।


Sunday, 17 August 2014

চাঁদপুর, রবিবার, ১৭ আগস্ট ২০১৪, ২ ভাদ্র ১৪২১, ২০ শাওয়াল ১৪৩৫


অনুশোচনা
সোহানুর রহমান অনন্ত
আয়নায় নিজের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো হাসান। ঘড়িতে বারোটা বাজার ঢং ঢং শব্দ। পেছনে এসে দাঁড়ালো নীলু। কি জনাব এখানে দাঁড়িয়ে কি করা হচ্ছে? নীলুর কথায় নিজেকে ফিরে পায় হাসান। কই কিছু না তো, এমনিতেই দাঁড়িয়ে আছি। নীলু আর হাসানের বিয়ে হয়েছে বছরখানেক হলো। দীর্ঘ চার বছর প্রেম করেছে দু'জন অবশেষে বিয়ে করছে পরিবারের স্ব-মতে। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আসো টেবিলে খাবার দেয়া আছে। ঠিক আছে তুমি গিয়ে শুরু কর আমি আসছি। একটা সিগারেট বের করে পকেট থেকে। জানালা দিয়ে আসছে দক্ষিণা বাতাস। মুখ থেকে ধোঁয়া ছেড়ে আবারো আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকায় হাসান। নীলুর কথা ভেবে ঠোঁটের কোণে পৈচাশিক হাসি ফুটে উঠে।

২.

নীলু ঘুমিয়েছে কি না ভালো করে দেখলো হাসান। ইদানীং ফেসবুকে একটি মেয়ের সাথে বেশ ভাব হয়েছে হাসানের। মেয়েটি জানতে চেয়েছে হাসান বিবাহিত কি না। হাসান বলেছে সে বিবাহিত না। কারণ আজকালকার মেয়েরা বিবাহিত শুনলে আর আগ্রহ দেখায় না। ফেসবুক লগিং করতেই মেয়েটির ম্যাসেজ চোখে পড়লো। চমৎকার করে ম্যাসেজ লেখে মেয়েটি। প্রোফাইল পিকচারটার ভালো করে দেখে নিল। আধুনিক মেয়ে, দেখতেও বেশ চমৎকার। কিন্তু সমস্যা হলো নীলুকে নিয়ে। কাবাব মে হাড্ডি। যদিও নীলু ফেসবুক সম্পর্কে তেমন কোনো ধরণা রাখে না। ধারণাটা হাসানেরও ছিলো না। অফিস কলিগ আকরাম মাসখানেক আগে আইডিটা খুলে দেয়। প্রথম প্রথম তেমন একটা বসা হয়নি, কিন্তু ইদানীং মেয়েটির কারণে বসা হয়। এত সহজে যে এত সুন্দরী মেয়ের সাথে প্রেম হয়ে যাবে হাসান ভাবতেও পারেনি। অপেক্ষা করতে থাকে মেয়েটির জন্য। কিছুক্ষণ পর মেয়েটি লাইনে আসে এবং দুজনের চ্যাট শুরু হয়। নীলু আচমকা ঘুরে হাসানের হাতের উপর নিজের হাতটা রাখে। হাসান ভয় পেয়ে গিয়েছিলো কিন্তু না সব ঠিক আছে। নীলু ঘুমের মধ্যে এমনটা করেছে। হাসান মেয়েটির সাথে চ্যাটে মনোযোগী হয়।

৩.

ইদানীং হাসানের কাজে মন বসে না। সুযোগ পেলেই ফেসবুকে ডু মারে। মেয়েটির সাথে চ্যাট করতে মনটা ছটফট করে। এক অন্য রকম আকর্ষণ আছে মেয়েটির মাঝে। ফোনটা বেজে উঠতেই মোবাইল স্কীনে নিলুর নামটা ভেসে উঠে। হ্যালো, দুপুরের খাবার খেয়েছো? নাহ্। কেন? সময় পাইনি, আর কিছু বলবে? একটা কথা ছিলো। কি কথা? ভাবছি ফোনে নয় তোমাকে সরাসরি বলবো। ওকে আমি এখন রাখছি অনেক ব্যস্ত। এই বলে ফোনটা রেখে দেয় হাসান। ইদানীং আর নীলুকে ভালো লাগে না ওর। মন পড়ে থাকে ফেসবুকের অপরিচিত মেয়েটির কাছে। ওহ্ মেয়েটির নামই তো বলা হয়নি। তানিশা চৌধুরী, গুলশানে থাকে। মেয়েটির কথা মনে পড়তেই মনটা আনন্দে ভরে উঠে হাসানের। রাতে বাসায় ফিরতেই নীলু বলে উঠলো। আজকাল অনেক রাত করে অফিস থেকে ফিরছো, বউকে যে একটু সময় দিতে হয় সেটাও বুঝি ভুলে গেছো? হাসান কিছুই বলে না নীলুর কথায়। চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ। নীলু হাসানের হাত ধরে বলে, একটা ভালো খবর আছে। কি ভালো খবর? আমাদের...। কি আমাদের? আমাদের সন্তান আসছে...কথাটা বলেই লজ্জায় মুখ লুকিয়ে নেয় নীলু। কথাটা শুনে আনন্দে মনটা ভরে উঠে হাসানের কিন্তু মুহূর্তেই সেই আনন্দ মিলিয়ে যায়। মুখে এক টুকরো হাসি ফুটিয়ে ফ্রেশ হতে চলে যায়। নীলু তাকিয়ে থাকে হাসানের দিকে। মুখে বিস্ময়।

৪.

দায়িত্বে অবহেলার কারণে চাকুরিটা চলে যায় হাসানের। তা ছাড়া কয়েকজন অভিযোগ করেছে হাসান এখন আর আগের মতো দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে না। সারাদিন ইন্টারনেটে পড়ে থাকে। চাকুরিটা হারিয়ে হাসান খুব ভেঙে পড়ে। হুট করে এমনটা হবে ভাবতেও পারেনি সে। অফিস থেকে বের হয়ে লোকাল বাসে চড়ে বসে। মোবাইলটা বের করে লগইন করতেই মেয়েটির ম্যাসেজ। তোমার কথা বাবাকে বলেছি, বাবা বলেছে সে আমাদের বিয়েতে রাজি আছে। খুব দ্রুত তোমার সাথে কথা বলবে। কথাটা শুনে মনটা ভালো হয়ে যায় হাসানের। একদিকে সুন্দরী বউ অন্যদিকে কোটি টাকা। রাজ্য, রাজকন্যা সবি আমার হাতে। কিন্তু সমস্যা হলো নীলুকে নিয়ে। ও থাকতে অন্য কোনো মেয়ের সাথে বিয়ে তো দূরের কথা, বন্ধুত্ব শুনলেও খবর আছে। একটা ফন্দি আসে হাসানের মনে। লোভে চকচক করে উঠে হাসানের চোখ। একটা পথই আছে এখন সমাধান হিসেবে। আর সেটাই আজ রাতে করবে হাসান। বিকেলের আকাশটা তখন মেঘে ঢেকে গেছে। কেবল বৃষ্টি আসার অপেক্ষায়।

৫.

বৃষ্টি থেমে গেলেও আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। হাসানের হাতটা আরো শক্ত করে ধরে নীলু। এত রাতে ছাদে নিয়ে এলে কেনো হাসান। দেখ না তোমাকে বিয়ে করার পর রাতের আকাশ দেখা হয়নি। তাই ভাবছি আজ দু'জন রাতের আকাশ দেখবো। সত্যি হাসান, তুমি আমাকে অনেক ভালোবাসো? সেটা আর বলতে হয় পাগলি, তোমাকে অনেক ভালবাসি। আশেপাশে তাকায় হাসান, রাতের শহর মোটামুটি ঘুমন্ত এখন। এক পা দু' পা করে একেবারে ছাদের এক কোণে চলে যায় দু'জন। এখান থেকে আকাশ দেখা যায়, দেখা যায় নিচের মাটিও তবে দুটোর দূরত্বই অনেক। নীলু আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। হাসান তাকাচ্ছে এদিক ওদিক। হঠাৎ নীলু কিছু বুঝে উঠার আগেই হাসান ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় নীলুকে। তারপর দ্রুত ছাদ থেকে নেমে যায়। নীলু বুঝতেও পারেনি, সে এবং তার অনাগত সন্তান কিছুক্ষণের মধ্যেই পৃথিবী থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে। হাসান রুমে এসে একটা বুদ্ধি বের করে ফেলে। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবে সে কিছু জানে না। তা ছাড়া নীলুর মাঝে মাঝে ছাদে যাওয়ার অভ্যাস আছে। বৃষ্টি হয়েছে হয়তো পা পিছলে পড়ে গেছে। সবি ঠিকঠাক আছে, পথের কাটাও শেষ। দেয়ালে বাঁধানো নীলুর ছবির দিকে তাকিয়ে হেসে উঠে হাসান। নীরব কণ্ঠে বলে আমাকে ক্ষমা করে দিও।

৬.

মোবাইলে ফেসবুক লগিং করতেই তানিশার নিউ ম্যাসেজ। বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে হাসান। কিন্তু ম্যাসেজটা পড়েই থমকে গেলো হাসান। মাথার উপর সবকিছু কেমন যেন ঘুরতে লাগলো। চোখের ভুল হচ্ছে না তো। তানিশা লিখেছে, আসলে তার ভুল হয়ে গেছে। হাসানকে বিয়ে করা তার পক্ষে সম্ভব না। কারণ তানিশার পুরনো প্রেমিক আবার ফিরে এসেছে। সো প্রথম প্রেম বলে কথা, তার কাছেই তানিশাকে ছুটতে হলো। হাসান যেনো তাকে ক্ষমা করে দেয়। হাসান জানতো না তানিশার আগে প্রেম ছিলো। তা ছাড়া বড় লোকের মেয়ে বলে কথা, একাধিক বন্ধু, প্রেমিক থাকতেই পারে। নিজের বোকামি বুঝতে পেরে নিজের চুলই ছিড়তে ইচ্ছে করছে হাসানের। খুব জোরে মোবাইলটাকে দেয়ালে ছুড়ে মারলো হাসান। সব নষ্টের মূল এই জিনিসটা। সব শেষ হয়ে গেছে তার। নীলুর কথা মনে পড়তেই দু'চোখ বেয়ে জল ঝড়ে পড়তে লাগলো। আর নীলুর গর্ভে থাকা হাসানের অনাগত সন্তান...। হাউমাউ করে কেঁদে উঠে হাসান। এ কি করলাম আমি.... কি করলাম। সব শেষ হয়ে গেলো।

৭.

নীলুর লাশের পাশে মানুষের ভিড়। রক্তে একাকার হয়ে গেছে পথের ধুলোগুলো। দূর থেকে তাকিয়ে দেখলো হাসান। চোখের কোণে তখনো কান্না। একবারের জন্যও আর নীলুকে দেখতে যেতে মন চাইছে না তার। অনুশোচনায় পুড়ছে। একজন শিক্ষিত ছেলে হয়ে এ কাজটা কিভাবে করলো? চারটি বছর প্রেমের পর যাকে বিয়ে করেছে। চার সেকেন্ডে তাকে শেষ করে দিলো? নিজেকেই ছিঃ ছিঃ দেয় হাসান। এক পা দু পা করে থানার দিকে হেঁটে যায়। সবকিছু স্বীকার করবে সে, অকারণে নীলুকে হত্যার কথা। কিছুই আর লুকাবে না। কিছুই না।

sranontojugantor@gmail.com

Saturday, 9 August 2014

চাঁদপুর, শনিবার, ৯ আগস্ট ২০১৪, ২৫ শ্রাবণ ১৪২১, ১২ শাওয়াল ১৪৩৫


কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি
সোহানুর রহমান অনন্ত


আমার মতো এমন একটি কালো মেয়ের পাশে হাঁটতে তোর খারাপ লাগে না? হাসতে হাসতে বললো জাকিয়া। আমি বুট চাবাতে চাবতে বললাম, এখানে খারাপ লাগার কি আছে? ভালো করে চোখ মেলে দেখ, আশেপাশে ছেলেদের পাশে কতো সুন্দরী মেয়ে আর তুই কিনা... এখনো স্টুপিড রয়ে গেলি। খোলা বাতাসে উড়ছিলো জাকিয়ার চুলগুলো, বার বার মুখের উপর আছড়ে পড়ছে বাঁধ ভাঙা ঢেউয়ের মতো। এমন হা করে কি দেখিস? তোকে দেখছি। আমার কি মাথায শিং গজিয়েছে? না, ঘাড়ের পাশ দিয়ে আরেকটা মাথা বের হচ্ছে। কি বললি, তুই একটা শয়তান, রেগে গেলো জাকিয়া। তোর কালো মুখটা রাগলে আরো ভালোলাগে। পাম দিচ্ছিস্? তুই আমার বন্ধু তোকে পাম দেয়ার কি দরকার। কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, যার হৃদয়টা নিখাদ সুন্দর। আহারে কতো রোমান্টিক কথা, তোর কথা শুনে আমার প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করছে। আমার প্রেমে পড়। মাথা খারাপ আমার। এখানে মাথা খারাপের কি হলো, পড়াশোনা তো শেষ করলি বিয়া শাদী এবার কর। কালো মেয়েদের কপালে এত সহজে বর জোটে না। আমাকে বিয়ে করবি? হেসে বললাম। তোর ফাজলামো করার অভ্যাসটা আর গেলো না। তুই তো দেখছি আটো মেশিন, সব কিছুকেই ফাজলামো মনে করিস্। আরে বাবা আমি তো সিরিয়াস। হয়েছে তোর সিরিয়াস নিয়ে তুই থাক আমি গেলাম। এই বলে জাকিয়া হাঁটতে লাগলো। আরে শোন, আমি কিন্তু আসলেই সিরিয়াস এই বলে জাকিয়ার পেছনে হাঁটতে লাগলাম।

২.

তুই আমাকে নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস্ দিলি কেন? ফোনটা ধরেই বললো জাকিয়া। কেনো তুই কি বারাক ওবামার বউ হয়ে গেছিস যে তোকে নিয়ে স্ট্যাটাস্ দেয়া যাবে না। দেখ আরিয়ান সব কিছু নিয়ে ফাজলামো করিস্ না। কেনো তোর বয়ফ্রেন্ড কিছু বলেছে স্ট্যাটাস্ দেখে? আশ্চর্য তুই দেখছি আমাকে নিয়ে জোক শুরু করে দিয়েছিস্। কি করবো সিরিয়াস কিছু বললেও তো তুই জোক হিসেবে দেখছ। শোন পড়াশোনা শেষ করেছিস্ এখন একটা চাকুরি বাকরি কর। তারপর বিয়ে করে সংসারি হ। আমি তো তোকে এটাই বুঝাতে চাই বন্ধু। মানে? মানে তোকে আমার ভালোলাগে। হাও ফানি, তোর মতো এমন স্মার্ট ছেলের পাশে আমার মতো একটা মেয়েকে মানাবে না বন্ধু। কি সব যে বলিস্ না তুই, কালোই জগতের আলো। হয়েছে তোকে আর কবি কবি ভাব দেখাতে হবে না। ফোনটা রাখ আমি ঘুমোবো অনেক রাত হয়েছে। তোর সাথে কথা বলতে ভালো লাগছে। তাহলে ফোন কানে নিয়ে থাক, আমি ঘুমালাম। আরে শোন, কি মেয়েরে বাবা, টু টু লাইন কাটার শব্দ।

৩.

জাকিয়াকে কোনোভাবেই বোঝাতে পারি না, ওকে আমি কতো ভালবাসি। আমার সব কথা ও জোক হিসেবে নেয়। আমি কষ্ট পাই, তবুও জোর করতে পারি না। আমি জাকিয়ার ভেতরের সৌন্দর্যকে দেখেছি, বাইরের রূপটা নয়। অর্থে অনেক সুন্দর মুখ মেলে কিন্তু সুন্দর মন মেলে না। যেটা জাকিয়ার মাঝে আমি পেয়েছি। ইদানীং জাকিয়ার সাথে তেমন একটা দেখা করি না, ওর সামনে গেলেই ওকে ভালবাসতে ইচ্ছে করে। যে ভালবাসাটা আমার কাছে সিরিয়াস হলেও জাকিয়ার কাছে জোক। ফিফা গেমস্-এর মতই নকল মানুষের কথা। এভাবেই আমার জীবন বয়ে চলে রেললাইনের মতো, একা একা।

৪.

আমি এখন ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে চাকুরি করি। কখনো সুন্দরবন তো কখনো রাঙামাটি। স্থায়ীভাবে কোথাও থাকতে পারি না। তাই জাকিয়ার সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ নেই। দীর্ঘ তিন বছর পর হঠাৎ জাকিয়ার ফোন পেয়ে বেশ আনন্দিত হলাম। কি ব্যাপার এতদিন পর মনে পড়লো? আমার তো মনে পড়েছে তোর বোদহয় তাও হয় না। তুই তো আমার মন নতুন করে মনে করার কি আছে তোকে। বিয়ে করেছিস্, মিষ্টি সুরে বললো জাকিয়া। নাহ্। কেন? তোর মতো কৃষ্ণকলি পাইনি বলে। জাকিয়া হেসে উঠলো, তোর সেই জোক করার অভ্যাসটা আজও গেলো না। আমার লাইফটাই তো জোক বন্ধু। শোন যে কারণে তোকে ফোন করেছি পরশু আমার বিয়ে তোকে আসতে হবে। শেষ পর্যন্ত বিয়াটা তোর হয়েই গেলো। কেন তুই কি দোয়া করেছিস্ আমার বিয়ে না হোক? নাহ্ তা কেন তোর বিয়ে হবে সংসার হবে এটাই তো আমি দেখতে চেয়েছিলাম। তা হলে চলে আসিস, রাখলাম। ফোনটা রেখে দিলো জাকিয়া। আমার সামনে তখন পড়ন্ত বিকেলের সূর্যটা হেলে পড়েছে। কেন যেন খুব খারাপ লাগছিলো, বুকের ভেতর একটা টান অনুভব করলাম। কি যেনো একটা হারিয়ে যাচ্ছে মন থেকে, ভালবাসা থেকে, সকল চাওয়া পাওয়া থেকে।

sranontojugantor@gmail.com