join facebook page

Showing posts with label daily nayadiganta (priojon). Show all posts
Showing posts with label daily nayadiganta (priojon). Show all posts

Wednesday, 2 March 2016

আজ প্রিয়জনে.... জনি হোসেন কাব্যকে ধন্যবাদ ইনবক্স করার জন্য

সাদা জোছনায় নীল কষ্ট

সোহানুর রহমান অনন্ত

বেশ কয়েকটা টোকা পড়ল জানালা দিয়ে। ‘দ্য ভিঞ্চি কোড’ বইটা নিয়ে মাত্র বসেছিল অধীর। শীতটা আজ খুব বেশি পড়েছে মনে হচ্ছে। ঠাণ্ডায় হাত-পা কেমন ঠকঠক করছে। অবশ্য বিকেল থেকেই আকাশ মেঘলা। জানালায় আবার টোকা পড়ার শব্দ। চাদরটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে জানালার কাছে এসে দাঁড়াল অধীর। এটা নতুন নয়, প্রায় রাতেই রুপা এসে জানালায় নক করে। তাই আর জিজ্ঞেস করতে হয় না। হাত বাড়িয়ে জানালাটা খুলে দিলো। ওপাশ থেকে ফিসফিস করে রুপা বলল, এত সময় লাগল কেন? ড্যান ব্রাউনের বই পড়ছিলাম, বইটি ওয়ার্ল্ড বেস্ট সেলার, তুমি পড়েছে? নাহ পড়িনি, আচ্ছা শোনো, তোমার মোবাইলে কি ব্যালান্স আছে। হ্যাঁ। একটু দাও, প্লিজ, জরুরি ফোন করতে হবে। এই বলে রুপা এদিক-ওদিক তাকায়। অধীর টেবিলের ওপর থেকে সেলফোনটা এনে রুপার হাতে দেয়। রুপা নম্বর ডায়াল করতে করতে ছাদের এক কোণে চলে যায়। অধীর জানালার কাছে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। ছাদের ওপর এই একটি মাত্র রুম। ভাড়া কম হওয়ায় অধীর অনেক দিন ধরেই আছে এখানে। রুপা অধীরের কাসমেট, এই বাসার তৃতীয়তলায় থাকে। বাবা পরহেজগার মানুষ, তাই রুপার হাতে কোনো মোবাইল ফোন দেয়নি। রুপা মাঝে মাঝেই এসে অধীরের ফোন দিয়ে কথা বলে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আবার ব্যালান্স রিচার্জ করে দেয়। জানালা দিয়ে হু হু করে মাঘের হাওয়া ঘরে আসছে। অধীর দরজা খুলে রুপার দিকে হেঁটে গেল। রুপা অধীরকে দেখে কথা বন্ধ করে দেয়। কিছু বলবে? ইয়ে মানে... বাইরে অনেক ঠাণ্ডা তুমি চাইলে চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিতে পারো। না ঠিক আছে, আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না, তুমি যাও। অধীর যেভাবে এলো আবার সেভাবেই চলে এলো রুমের মধ্যে। টেবিলে বসে আবার বইটা পড়তে লাগল। আধা ঘণ্টা পর রুপা এসে মোবাইলটা রেখে পাশের বিছানায় সটান বসে পড়ল। অধীর মোটা ফ্রেমের চশমার ফাঁক দিয়ে একবার তাকালো, তারপর আবার বইয়ে মনোযোগ দিলো। রুপার চোখে মুখে বিরক্তি, আচ্ছা বই পড়া ছাড়া কি আর কোনো কাজ নেই তোমার? আছে তো। কী? বই কেনা। হোয়াট? রেগে যাচ্ছ কেন? রাগার কথা বলবে আর আমি রাগতে পারব না? মেয়েরা অহেতুক উত্তেজিত হয়, তুমি জানো অহেতুক উত্তেজিত হলে শরীরের রক্ত চলাচল বেড়ে যায়। হয়েছে হয়েছে, আর জ্ঞান দিতে হবে না। আচ্ছা শোনো, তোমার মোবাইলের ব্যালান্স শেষ করে ফেলেছি। কাল ভার্সিটিতে গিয়ে রিচার্জ করে দেবো। আমি তো তোমার কাছে চাইনি? তোমার চাইতে হবে নাকি? যাচ্ছি কাল দেখা হবে। শোনো? কী? তুমি রোজ রোজ কার সাথে কথা বলো? রুপা একেবারে অপ্রস্তুত হয়ে গেল। এমন প্রশ্ন এর আগে করিনি আমি, আজই প্রথম করলাম। আমতা আমতা করে বলল, আরেক দিন বলি? ঠিক আছে। রুপা চলে গেল, অধীর মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখল, আজো কল করা নাম্বারটা ডিলিট করে গেছে রুপা। হয়তো রুপা চায় না, অধীর জানুক রুপা কার সাথে কথা বলে। মুচকি হেসে বইয়ে চোখ রাখল অধীর।
এখন আর রুপাকে তেমন একটা দেখা যায় না। ছাদেও আসে না, ভার্সিটিতেও যায় না। একই বিল্ডিংয়ে থাকে তবুও যেন দূরের মানুষ রুপা। সে দিন রুপার ছোট বোনের সাথে দেখা হতেই জানতে পারল রুপার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। কথাটা শুনে কষ্ট পেলেও মুখে ম্লান এক টুকরো হাসি ফুটিয়ে বলল, বেশ তো, রুপা এবার সংসারী হবে। সে রাতে অনেক কেঁদেছে অধীর। রুপার থেকে অনেক দূরে চলে যাওয়ার জন্য শেষরাতে পা বাড়াল বাড়ির বাইরে। শান্ত নগরী তখনো ঘুমিয়ে আছে।
অনেকক্ষণ জানালায় টোকা দিলো রুপা। কিন্তু ভেতর থেকে জানালা খুলছে না অধীর। বিরক্ত হয়ে দরজায় টোকা দিতেই দরজাটা খুলে গেল। ঘরে প্রবেশ করতেই দেখে অধীর নেই। নজরে পড়ল টেবিলের ওপর রাখা একটা চিঠির ওপর। কাছে যেতেই দেখল। বড় করে লেখা ‘রুপা এই চিঠিটা তোমার জন্য’। রুপা কিছুই বুঝতে পারল না, চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করে...
‘এই চিঠিটা তুমি যখন পড়ছ, আমি তখন তোমার থেকে অনেক দূরে। রুপা, আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসো না, কিন্তু বিধাতার কী অপরূপ খেলা, আমি তোমায় ভালোবাসি। অথচ একবারও তোমায় সে কথাটা বলতে পারিনি। বিশ্বাস করো, তুমি যতবার আমার সামনে এসে দাঁড়াও, ততবারই আমার ভালোবাসা দিগুণ হয়ে যায়। তাই তোমার সুখের কথা ভেবে আমি অনেক দূর চলে যাচ্ছি। এই শহর ছেড়ে আমার সেই গ্রামে। যেখান থেকে এসেছিলাম, ঠিক সেখানে। এই জীবনে তোমার সাথে আর কখনো দেখা হবে কি না জানি না। শুধু এতটুকুই বলব, সুখে থাকো তুমি। অনেক বেশি সুখে থাকো।’ চিঠিটা শেষ হতেই রুপার দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে। কেন, রুপা নিজেও জানে না। বাইরে তখন জ্যোৎস্নার আলো আরো তীব্র হয়ে উঠেছে।
পরিশেষ : স্কুল থেকে বের হয়ে সাইকেলে চড়ে বসল অধীর। বয়সের ভারে আজকাল তেমন একটা সাইকেল চালাতে পারে না। শহর থেকে আসার পর এই হরিরামপুর স্কুলে চাকরি নেয়। তারপর এখানে কেটে গেছে ত্রিশটি বছর। আজো বিয়ে করেনি।
sranontojugantor@gmail.com - See more at: http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/85597#sthash.0iyxkW3O.dpuf

Tuesday, 13 January 2015

Thursday, 27 November 2014

Aj 22-11-2014 daily nayadiganter priojon-a amar golpo

বুকপকেট
সোহানুর রহমান অনন্ত

ভাঁজ করা চিঠিটা সব সময় বুক পকেটে রাখে মুকুল। বেশ কয়েকবার ভেবেছে এটা চৈতিকে দিয়ে দেবে। কিন্তু সেই সুসময়টা যেন আসি আসি করেও আর আসে না। মুকুল চৈতির ছোট বোনকে পড়ায়। পড়ার ফাঁকে যতটুকু সম্ভব আড়চোখে তাকায় দরজার দিকে। পর্দার ফাঁকে মাঝে মাঝে চৈতির এপাশ-ওপাশ আসা যাওয়া চোখে পড়ে। কানটা খাড়া করে রাখে, চৈতির কণ্ঠ শোনার জন্য। মাঝে মাঝে চা হাতে চৈতি রুমে প্রবেশ করে। আসে কিন্তু দাঁড়ায় না এক মুহূর্তের জন্য। এ যেন উড়ে আসা এক টুকরো মেঘ। আজো মুকুল বুকপকেটে চিঠিটা সযতেœ নিয়ে প্রবেশ করেছে চৈতিদের বাসায়।
বুক পকেটে হাত রাখে মুকুল। রিকশাটা যেন খুব দ্রুত চলছে। আড়চোখে আবারো চৈতিকে দেখা, লাল টিপটার পাশ ঘেঁষে এক ফোঁটা ঘাম এসেছে জমেছে। যেন চাঁদের পাশে এক টুকুরো মেঘ। আমি জানি না আমার এই তাকানোটা চৈতি বুঝতে পেরেছে কি না। হঠাৎ চৈতি বলে ওঠে, স্যার, একটা কথা বলি?
মুকুল সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত হয়ে যায়। কাঁপাকাঁপা গলায় বলে কী কথা? একটা কথা জানেন তো, মেয়েরা ছেলেদের মনের কথা খুব সহজে বুঝতে পারে। আপনি বোধহয় আমাকে কিছু বলতে চাইছেন।
মুকুলের বুকটা ধপাস করে ওঠে। বুকপকেটে আবার ডান হাতটা রাখে। চৈতি আবার বলে ওঠে, কিছু বলছেন না যে?
ইয়ে মানে... তোমাকে একটা জিনিস দেবো, তবে কথা দাও এই বিষয়ে তুমি কাউকে কিছু বলবে না। চৈতি মুকুলের দিকে তাকাল। ওর কাজল কালো চোখে অমৃতের সুখ। হালকা মাথাটা নাড়িয়ে বলল, ওকে, বলব না।
মুকুল বুকপকেট থেকে চিঠিটা বের করে চৈতির হাতে দিয়ে দেয়। তারপর আর একটিবারের জন্যও লজ্জায় তাকাতে পারে না চৈতির দিকে। চৈতি মিটিমিটি হেসে বলে, পুরুষ মানুষের এতটা লজ্জা পাওয়া কি ঠিক? মুকুল কিছুই বলতে পারে না উত্তরে। চিঠিটা চৈতির হাতে সাহস করে দিতে পেরেছে, এটাই তার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। শেষবারের মতো মুকুল আড়চোখে চৈতির দিকে তাকায়। দেখে চৈতি মিটিমিটি হাসছে।
এখন রোজ একটি করে চিঠি বুকপকেটে করে নিয়ে আসে মুকুল। চৈতি চা দেয়ার নাম করে এসে চিঠিটা নিয়ে যায়। আবার সেগুলোর উত্তর দেয়। চমৎকার করে গুছিয়ে লেখে প্রতিটি লাইন। যেন একটি লাইনই একটি ভালোবাসার গল্প। চৈতির জীবনানন্দ দাশের কবিতা পছন্দ। মুকুল তাই জীবনানন্দের কবিতার লাইন কেটে চিঠিটা আরো বড় করে দেয়। এভাবেই জীবনের কিছুটা বেলা কেটে গেছে মুকুলের। বুকপকেটটা যেন ভালোবাসার ডাকবাক্স। প্রতিটি চিঠি জমা থাকে তার ভেতর। সেদিন বিকেলে বাসায় ঢুকতেই দেখে। কী একটা বিষয় নিয়ে চৈতির মা চৈতিকে খুব বকাঝকা করছে। মুকুলকে দেখে অবশ্য তাড়া ভেতরের রুমে চলে যায়। নূপুরের কাছ থেকে বিস্তারিত শুনতে পায় মুকুল।
চৈতিকে এলাকার একটি ছেলে বেশ কিছু দিন ধরে বিরক্ত করছে। কিন্তু চৈতির মায়ের ধারণা, এতে চৈতিও যোগ আছে। সে কারণেই বকাঝকা করছে। কথাটা শুনে কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে যায় মুকুল। সে দিনের পর থেকেই চৈতির মা চৈতির বিয়ে দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে। ঘটনাচক্রে মুকুল নিজেই সাহস করে প্রস্তাব দেয়। চৈতির মা এতে আর আপত্তি করে না। সব কিছুই চলছিল সাজানো গোছানো। হঠাৎ বিয়ের দুই দিন আগে চৈতি নিখোঁজ হয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজি করা হয়, কিন্তু কোথাও নেই। মুকুল মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। বুকের বাম পাশটায় চিনচিনে ব্যথা অনুভব করে। ১০ দিন পর চৈতিকে পাওয়া যায় ঢাকার উত্তরায়। চৈতি ধর্ষিত হয়েছে।
সে দিন কলেজ থেকে ফেরার পথে চৈতিকে তুলে নিয়ে যায়, এলাকার বখাটে সেই ছেলেটি। তারপর উত্তরায় একটি নির্জন ফ্যাটে আটকে রেখে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। সেখান থেকে চৈতি পালিয়ে যায় এবং আশঙ্কাজনক অবস্থায় লোকজন ওকে হাসপাতালে ভর্তি করে।
জ্ঞান ফেরার পর এসবই বলেছে চৈতি। কিছুই লুকায়নি। চৈতির মা, আড়ালে ঢেকে নিয়ে সব কথাই বলে মুকুলকে। তিনি ভেবেছিলেন হয়তো মুকুল শোনার পরে বিয়েটা ভেঙে দেবে। এটা ভাবার যুক্তিগত কারণও আছে।
কোনো পুরুষ জেনেশুনে চায় না একজন ধর্ষিতাকে বিয়ে করতে। কথাগুলো শুনে মুকুল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। চৈতির মায়ের চোখে পানি, এমন দুর্দিন দেখতে হবে, তিনি কল্পনাও করেননি। মুকুল চৈতির মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, আমাদের দেশে বেশির ভাগ নারী এমন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কিছু প্রকাশ হচ্ছে কিছু হচ্ছে না। এর জন্য অবশ্য সমাজের উঠতি বয়সের যুবকদের অবক্ষয়কই দায়ী।
একজন ধর্ষিতা সমাজের বাইরের কেউ নন। তাকে পুনরায় ভালোবেসে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব। চৈতিকে আমি ভালোবেসেছি, যেমনটা প্রথমে বেসেছিলাম তেমনটি এখনো বাসি এবং ভবিষ্যতেও বেসে যাবো।
মানুষের জীবনে অনেক রকম দুর্ঘটনা ঘটে। এসব মেনে নিয়েই মানুষকে এগিয়ে যেতে হয়। চৈতিকে ছেড়ে চলে গেলে আমার মন আমাকে কখনো সুখী হতে দেবে না। এই বলে মুকুল চৈতির বেডের দিকে পা বাড়াল। ঝাপসা চোখে চৈতির মা তাকিয়ে রইলেন মুকুলের দিকে। চৈতির মাথার কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল মুকুল। চৈতি ঘুমিয়ে আছে। বুকপকেটে আজো একটা চিঠি রয়েছে। চৈতি বলেছে বিয়ের পরও রোজ একটি করে চিঠি দিতে হবে।
সাথে জীবনানন্দের কবিতা। মুকুল বুকপকেট থেকে চিঠিটা বের করে চৈতির বালিশের নিচে রাখে। তারপর নিঃশব্দে বেরিয়ে যায়। বুকের শূন্যতাটা মিটে গেছে চৈতির মুখ দেখে।
বারান্দায় দাঁড়াতেই মেঘলা আকাশটা চোখে পড়ল। মুকুল এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আকাশের দিকে।

Saturday, 30 August 2014

২৮ আগস্ট ২০১৪, বৃহস্পতিবার daily noyadeganta

কাছে-দূরে
সোহানুর রহমান অনন্ত

কাউন্টারে তিল ধারণের জায়গা নেই। কোনো রকম বাসে উঠে বসলাম। এত বিরক্তির মধ্যেও আনন্দ আছে। বাড়ি ফেরার আনন্দ, মায়ের মুখ দেখার আনন্দ। আমার পাশের সিটে একটি মেয়ে বসেছে; যাকে বলে একেবারে আধুনিক স্টাইলের মেয়ে। আমি ব্যাগটা রেখে বসে পড়লাম। পাশের সিটের মেয়েটি কানে হেডফোন লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে গান শুনছে।
আমি মাঝে মধ্যে মেয়েটির দিকে টেরাভাবে তাকাচ্ছিলাম। সে একমনে গান শুনে যাচ্ছে। বাস চলতে শুরু করল ধীরে ধীরে। ইট-পাথরের শহর ছেড়ে দূর গাঁয়ের উদ্দেশে। গাড়ির মধ্যে যাত্রীদের হইচই থেমে গেছে। আমার চোখ একবার জানালায়, একবার মেয়েটির দিকে। পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফেসবুক ওপেন করলাম। পিকচারবিহীন মেয়েটির মেসেজ। অবশ্য অনেক আগে পাঠিয়ে রেখেছে।
আমি কোনো উত্তর না দিয়ে হোমপেজ দেখছিলাম। এমন সময় পাশের মেয়েটি কানের হেডফোন খুলে একবার আমার দিকে তাকাল। তারপর জানালা দিয়ে বাইরে চোখ রাখল। আমি আবারো টেরা চোখে তাকাতে লাগলাম। ছেলেদের মনের ভাষা বুঝে ফেলার অসাধারণ এক মতা নাকি মেয়েদের মধ্যে আছে। সেটাই সম্ভবত হয়েছে। মেয়েটি বোধহয় বুঝে ফেলেছে আমার আড়চোখে দেখার ব্যাপারটা। আর তাকাব না পণ করে মোবাইলে চোখ রাখলাম। একটা স্ট্যাটাস দিলাম বাড়ি যাওয়া নিয়ে।
পিকচারবিহীন মেয়েটি এখন লাইনে। কেমন আছো? ফাইন, ইউ? আছি ভালো, তুমি? ভালো, ঈদ কোথায় করবে? বাড়িতে যাচ্ছি, ওখানেই বাবা-মায়ের সাথে করব। কিভাবে যেন পাশের সিটের মেয়েটির দিকে আবার চোখ চলে গেল। মুচকি মুকচি হাসছে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে। অবশ্য এমন একটি সুন্দরী মেয়ে পাশে বসা থাকলে চোখ ভুল করতেই পারে।
এভাবে আবার তাকানোর জন্য নিজেকেই নিজে বকতে লাগলাম। আমিও বাড়ি যাচ্ছি, এখন বাসেÑ বলল পিকচারবিহীন মেয়েটি। ভেরি গুড, তা তোমার পিকচার দাও না কেন? আমি পিকচারবিহীন মানুষ হা হা হা। কিভাবে যেন সময় চলে গেল।
বাস এসে থেমেছে জংতলা স্টেশনে। এখানেই নামব আমি। নামার আগে ইনবক্সে আরো একটা মেসেজ এলো। আপনি এখন কোথায়? পিকচারবিহীন মেয়েটি জানতে চাইল। জংতলা স্টেশনে, ঈগল কাউন্টারের সামনে বাস থেকে নামব। এই বলে মাত্র বাস থেকে নামলাম। আবারো মেসেজÑ বলেন কী! আমিও তো জংতলা স্টেশনে, ঈগল বাসে বসে আছি। বেশ উত্তেজিত হয়ে গেলাম, কোথায় তুমি? আমি তো বাসের কাছেই। মেয়েটি জানালা দিয়ে মাথা বের তাকাল। আমিও তাকালাম, চোখে চোখ পড়ে গেল। বাস ততণে চলতে শুরু করেছে।
হায় নিয়তি! এতটা পথ যার সাথে বসে এলাম সেই যে পিকচারবিহীন বালিকা, সেটা কে জানত। বাস এক সময় চোখের আড়াল হয়ে গেল। আমি তখনো তাকিয়ে রইলাম। ফেসবুক ইনবক্সে মেসেজের টুংটাং শব্দ।

Sunday, 13 July 2014

১০ জুলাই ২০১৪, বৃহস্পতিবার, ৯:৪৮

প্রতিশোধ
এস আর অনন্ত

সন্ধ্যা থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। প্রতিদিনের ব্যস্ততম স্টেশনটি আজ একেবার শূন্য। কেবল একটি মেয়ে ব্যাগ হাতে বেঞ্চে বসে আছে, আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আমি দূর থেকে দেখছিলাম। যদিও কোনো ভাবনা এখনো মনে ডালপালা মেলেনি। ও আমার পরিচয়ই তো দেয়া হয়নি। আমি শাফী মাহমুদ।
ব্যাচেলর মানুষ, স্টেশনের পাশে ছোট একটা চা-পানের দোকান। ছোট হলেও ব্যবসায় তো! নিজেকে ব্যবসায়ী ভাবা দোষের কিছু নয়।
অন্ধকারের বুক চিরে দানবীয় ট্রেনটি এসে থামল স্টেশনে। আমি ভাবলাম, হয়তো মেয়েটি ট্রেনে উঠে যাবে। কিন্তু না, দু-চারেক লোক ট্রেন থেকে নামল, তারপর এদিকে-ওদিক করে স্টেশন থেকে হারিয়ে গেল। ট্রেনটাও গর্জন করে আবার চলতে লাগল। এবার আমি রীতিমতো অবাক। মেয়েটির মতলব কী? ট্রেনেই যেহেতু যাবে না, তাহলে এই রাতে স্টেশনে মেয়েটি কী করছে? হাজার প্রশ্ন আসে মনের ভেতর, যার উত্তর কেবল মেয়েটিই দিতে পারে।
দুই.
ঘড়িতে ১০টা ছুঁই ছুঁই। প্রতিদিন রাত ১২টা পর্যন্ত থাকলেও আজ আর থাকা চলবে না। এমন বাদলা দিনে কোনো খদ্দের আসে না। কেবল মিছে মিছে বসে কেরোসিন খরচ। দোকানটা বন্ধ করার আগে আরেকবার তাকালাম মেয়েটির দিকে। মেয়েটি এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। মনে হচ্ছে, কারো জন্য অপেক্ষা করছে মেয়েটি। কিছুটা ধীরপায়েই এগিয়ে গেলাম মেয়েটির দিকে। আমাকে দেখে ভূত দেখার মতোই চমকে উঠল। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, কী চান আপনি?
ইয়ে, মানে আমি অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ করছি আপনি কারো জন্য অপেক্ষা করছেন। খোলা স্টেশন জনমানবশূন্য, তা ছাড়া এমন বাদলা দিনে একটি মেয়ে একা বসে থাকা নিরাপদ নয়।
মেয়েটি মনে হয় আমাকে কিছুটা বিশ্বাস করল। মেয়েটি মাথা নাড়িয়ে বলল, জি একজনের জন্য অপেক্ষা করছি, তবে মনে হচ্ছে সে আর আসবে না।
কার জন্য, আপনার কোনো আত্মীয়?
না, একজন অপদার্থ মানুষের জন্য।
ঠিক বুঝলাম না।
মেয়েটি আমার দিকে তাকাল। বাইরে বৃষ্টি, এখানে মেয়েটির চোখে বৃষ্টি। দুই মিলে যেন এক মহাপ্রলয় সৃষ্টি করেছে এই ধরায়। আমি যাকে ভালোবাসি তার জন্য। ও বুঝেছি, মানে আপনি ঘর থেকে পালিয়েছেন?
বলতে পারেন, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেটাই ভুল হয়েছে আমার।
তা এখন কোথায় যাবেন?
জানি না, কোথাও যেতে না পারলে ট্রেনের তলে ঝাঁপ দেবো।
মৃত্যুটাই কি সমাধান? এমনও হতে পারে, আপনার ভালোবাসার মানুষটি কোনো ভয়ানক বিপদে পড়েছে, তাই আসতে পারেনি।
মেয়েটি আমার কথায় যেন আশার আলো দেখতে পেল। বলল, সত্যি বলছেন আপনি?
সত্যি কি না জানি না, তবে মনে হলো।

তিন.
মেয়েটি আবার এদিক-ওদিক তাকাল, কাছে কোথাও শিয়াল ডাকছে। স্টেশনের কোণে এক শ’ পাওয়ারের একটি বাল্ব জ্বলছে। হঠাৎ লোডশেডিং হওয়ায় চার দিক অন্ধকারে ঢেকে গেল। মেয়েটি ভয়ে ভয়ে বলল, আপনি আছেন?
জি, আছি। ভয় পাবেন না। আলোর ব্যবস্থা করছি।
টর্চটা জ্বালালাম। মেয়েটির চোখেমুখে ভয়ের ছাপ।
রাত তো অনেক হলো, আমাকে যেতে হচ্ছে আপনি কি এখানেই থাকবেন? আপনি চাইলে আমি থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারি, কাল সকালে হয়তো আপনার ভালোবাসার মানুষটির সাথে যোগাযোগ হয়ে যাবে। মেয়েটি কোনো কথা বলল না।
আমি বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। মেয়েটি পেছন থেকে বলল, প্লিজ আমাকে একা ফেলে যাবেন না।
আমি পেছন ফিরে তাকালাম। তার মানে আপনার জন্য থাকার জায়গা ঠিক করে দেবো। মেয়েটি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়াল। চলুন তাহলে।
চার.
আগেই বলেছি, আমি ব্যাচেলর। একলা বাসায় থাকি। মেয়েটিকে একটি রুম দেখিয়ে বললাম, এই ঘরে আপনি থাকতে পারেন। মেয়েটি ব্যাগটা রেখে বসে পড়ল। কিছু খেয়েছেন?
না।
ঠিক আছে আপনি বসুন, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন ব্যাচেলর মানুষ, নিজেকেই রান্না করতে হয়। তবে বেশিক্ষণ লাগবে না, আপনি ফ্রেশ হন, ওই সামনেই ওয়াশরুম।
চমৎকার একটা পারফিউমের ঘ্রাণ নাকে এসে ধাক্কা খেলো। পেছনে ফিরে মেয়েটির দিকে তাকালাম। এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলাম আমি। একটু আগে মেয়েটি সালোয়ার-কামিজ পরা থাকলেও এখন ফ্রেশ হয়ে একটা শাড়ি পরেছে।
আমার ভেতরের নরপশুটা জেগে উঠল। আজ রাতে সত্যিই প্রলয় হতে যাচ্ছে। মহাপ্রলয়।
পাঁচ.
অনেক কিছু ঘটে গেল কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। আমার ভেতরের পুরুষত্বকে দেখাতে আমি হায়েনা হয়ে গেলাম। একটি মেয়ে রাতের অন্ধকারে একটি পুরুষের কাছে কতটা অসহায়, সেটা এই প্রথম বুঝলাম। মেয়েটি যে নিজেকে রা করার চেষ্টা করেনি তা কিন্তু নয়। কিন্তু আমার শরীরে যেন অসম শক্তি ভর করেছিল।
ছয়.
কেটে গেল অনেক দিন-মাস। সেদিন আকাশ ভরা মেঘ, দোকানের সামনে এসে বসল ছাদেক মাস্টার। কই দাও তো এক কাপ চা, চিনি কম। আমি চা বানিয়ে ছাদেক মাস্টারের দিকে এগিয়ে দিলাম। চায়ে চমুক দিয়ে ছাদেক মাস্টার বলল, তা দোকান করেই কি জীবন যাবে, বিয়াশাদি এইবার কিছু করো। আমি হেসে বললাম, তা আর বলব কী চাচা, মেয়েই পাই না পছন্দমতো।
বুঝেছি তুই আমার মতো, জোয়ান বয়সে আমিও এমন ছিলাম, সহজে মেয়ে পছন্দ হতো না, আমার বাবা-মা যে কত মেয়ের ফটো নিয়ে ঘুরত আমার পেছনেÑ এই বলে হাসতে লাগল।
আকাশের দিকে তাকিয়ে ছাদেক মাস্টার বলল, বৃষ্টি হবে নাকি আজ, এই অবেলায় বৃষ্টি। আমি বললামÑ হতে পারে, প্রকৃতির নিয়ম বোঝা বড় মুশকিল। ঠিক আছে, আমি উঠি রে। ছাদেক চাচা চলে গেল। ঠিকই বৃষ্টি শুরু হলো। ঝুমবৃষ্টি। এখন বিকেল, না সন্ধ্যা বোঝা মুশকিল।
স্টেশন একেবারেই ফাঁকা, ঠিক সেই দিনের মতো। আমি দ্রুত দোকান বন্ধ করে দিলাম। এমন বাদলা দিনে বসে থেকে লাভ নেই, তার চেয়ে বরং বাসায় গিয়ে আরামের একটা ঘুম দিই। অন্ধকার রেললাইন দিয়ে চলতে লাগলাম।
সাত.
এই পথ দিয়ে আজ ছয় বছর চলছি আমি, কখনো এমন লাগেনি। আবারো সেই শব্দ, এবার সাথে সাথে পেছনে ফিরে তাকালাম এবং টর্চ মারলাম, সাথে সাথে চমকে উঠলাম। একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে এবং মেয়েটি আমার খুব পরিচিত। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললাম তুমি?
হ্যাঁ আমি। চিনতে পেরেছ তাহলে।
কিন্তু তুমি কিভাবে, তোমাকে তো আমি নিজ হাতে খুন করেছি।
মেয়েটি হেসে উঠল, আমি বিশ্বাস করেছিলাম তোমাকে। কিন্তু সেই বিশ্বাস তুমি রাখনি। আমার সব কিছু শেষ করে ছিলে, আমি তোমার কাছে কেবল প্রাণটুকু ভিক্ষা চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমি দাওনি, রাতের অন্ধকারে আমাকে মেরে ফেলে রেখে গিয়েছিলে রেললাইনের ওপর।
আমি কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললাম, আমার ভুল হয়ে গেছে, আমাকে মাফ করে দাও। মেয়েটি ক্ষোভ নিয়ে আমার দিকে তাকাল। ভুল মানুষ জীবনে একবারই করে, এই বলে মেয়েটি আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। আমি ভয়ে ছুটতে লাগলাম। পাগলের মতো ছুটতে লাগলাম। আমার পেছনে ট্রেনের ভয়ানক শব্দ। তবুও আমি দৌড়াচ্ছি, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াচ্ছি।
অবশেষে দানবের মতো ট্রেনটা এসে ধাক্কা মারল আমায়। একটা অট্টোহাসির শব্দ কানে ভেসে এলো। তারপর সব অন্ধকার।
আট.
জংতলার স্টেশন থেকে কিছুটা দূরে মানুষের জটলা। একজন লোক ট্রেনে কাটা পড়েছে, তবে লোকটা অজ্ঞাত নয়। সবাই চিনতে পারল লোকটা স্টেশনের চা-পান বিক্রেতা শাফী মাহমুদ।
sranontojugantor@gmail.com